ঘূর্ণিঝড় মোন্থার প্রভাব ও নিম্নচাপের কারণে গত বৃহস্পতিবার থেকে টানাবৃষ্টিতে রোপাআমন ধানের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার (১ নভেম্বর) রাতের ঝুম বৃষ্টির পাশাপাশি ঝরো বাতাসে কৃষকের জমির পাকা ও আধাপাকা ধান পানিতে হেলে পড়েছে। সবজির জমিগুলোতে পানি জমায় ফসলের বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা।
বগুড়া: টানাবৃষ্টিতে রোপাআমন ধানের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বগুড়ার কৃষকরা। বৃষ্টির পাশাপাশি ঝরো বাতাসে কৃষকের জমির পাকা ও আধাপাকা ধান পানিতে হেলে পড়েছে। গত বুধবার থেকে শনিবার (১ নভেম্বর) বিকেল ৩টা পর্যন্ত বগুড়ায় ১২৫ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
এতে বগুড়া সদরসহ আশেপাশের উপজেলার অনেক জমির রোপাআমন ধান ঝরো বাতাসে নুয়ে পানির সঙ্গে মিশে গেছে। আরও ক্ষতির আশঙ্কা বেড়েছে-আগাম আলুসহ অন্যান্য শাকসবজি ক্ষেতের। এই অবস্থায় কৃষি কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে মাঠ পর্যায়ে থাকতে বলা হয়েছে। কৃষকরা জানান, বৃষ্টি ও ঝরো বাতাসের কারণে অনেক স্থানে পাকা ও আধাপাকা ধান গাছ মাটিতে হেলে পড়েছে।
এতে পাকা আমন ধান নিয়ে ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা। জমির পাকা ধান এবং জমিতে কেটে রাখা ধান নিয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। ধানগুলো ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। এছাড়া অতিবৃষ্টিতে শীতের আগাম সবজি ক্ষেতে জমেছে পানি। ফসল বাঁচাতে নিজেদের মত করে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন তারা।
জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবছর জেলায় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৯৫ হেক্টর জমিতে রোপাআমন ধান রোপণ করা হয়েছে। আর আগাম আলু রোপণ করা হয়েছে ৩৫৫ হেক্টর জমিতে। সূত্র জানায়, রোপাআমন ধানের জমির পানি নিষ্কাশনের জন্য সব উ-পসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের জরুরি পরামর্শ দিয়ে মাঠ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। আর আবহাওয়া ভালো হলে দুই-তিন দিনের মধ্যে জমির পানিতে নুয়ে পড়া ধানের তেমন ক্ষতি হবে না। তবে হেলে পড়া ধান গান গুলো ঝুঁটি বেঁধে দিলে ক্ষতির পরিমাণ কম হবে।
এদিকে বগুড়ার আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় মোন্থার প্রভাবে এই বৃষ্টিপাত শুরু হয়। গত চার দিনে বগুড়ায় ১২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এরমধ্যে গতকাল শুক্রবার থেকে শনিবার (১ নভেম্বর) বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৭০ দশকি ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। রোববার থেকে বৃষ্টির প্রবণতা কমবে বলেও জানা গেছে।
নন্দীগ্রাম (বগুড়া): গত দু’দিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় নন্দীগ্রাম উপজেলায় শত শত কৃষক পড়েছেন মারাত্মক ক্ষতির মুখে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব না হলে শাকসবজি, মরিচ এবং আগাম জাতের আমন ধানের আবাদে ব্যাপক লোকসানের আশঙ্কা করছে কৃষকরা। সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ফসলের মাঠে পানি জমে গেছে এবং বাতাসে ধান গাছ ভেঙে পড়ে পানির ওপর ভাসছে। বাতাসে এসব এলাকার ধান গাছ হেলে পড়াসহ বিভিন্ন সবজির ক্ষেতেও পানি জমে আছে। কৃষকরা নিজ উদ্যোগে মেশিন চালিয়ে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন।
ধুনট (বগুড়া): ধুনট উপজেলায় পাকা রোপাআমন ধান নুয়ে পড়েছে। এছাড়া ক্ষতির মুখে পড়েছে শীতকালীন আগাম শাকসবজিসহ বিভিন্ন ধরনের রবিশস্য। কৃষকরা বলছেন, পাকা আমন ধান ঘরে তোলার এখনই মোক্ষম সময়। এই মুহূর্তে বৃষ্টি হওয়ায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আগামী দুইদিন রোদ না হলে এসব ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
ধুনট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ছামিদুল ইসলাম জানান, রোপাআমন ধানের জমির পানি নিষ্কাশনের জন্য সব উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করে জরুরি পরামর্শ দিয়ে মাঠ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। আর আবহাওয়া ভালো হলে দুই/তিনদিনের মধ্যে জমির পানিতে নুয়ে পড়া ধানের তেমন ক্ষতি হবে না।
আদমদীঘি (বগুড়া): উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় জমির উঠতি আমন ধানগাছ পানির নিচে রয়েছে। পাকা, আধাপাকা ধানের শীষ পানিতে ডুবে যাওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ২/৩ দিনের মধ্যে জমির পানি সরিয়ে না গেলে পানির নিচের থাকা ধানের শীষ পচন ধরে নষ্ট হবে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। ফলে উপজেলায় রোপাআমন ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শেরপুর (বগুড়া): এ উপজেলায় টানা তিনদিনের বৃষ্টিতে বিশেষ করে গতকাল শুক্রবার রাতে চার ঘণ্টার ভারি বৃষ্টিতে কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ভুট্টা, ধান, আলুসহ শীতকালীন রবি শস্যের ক্ষেত জলমগ্ন হয়ে পড়ায় চরমক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন কৃষকরা। টানা বৃষ্টিতে এমন অপ্রত্যাশিত ক্ষতি হওয়ায় প্রান্তিক কৃষকরা চরম হতাশায় ভুগছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই উপজেলায় সব মিলিয়ে প্রায় ৩১ হাজার হেক্টর জমিতে কৃষি আবাদ হয়। চলতি মৌসুমে শেরপুর উপজেলা মোট ২২ হাজার ৪৬০ হেক্টর জমিতে আমনের চাষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত শুধু শেরপুর উপজেলাতেই ২৫০ হেক্টর জমির ধান নুয়ে পড়েছে। নিম্নচাপের কারণে সৃষ্ট এই টানা বৃষ্টিতে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছেন।
সোনাতলা (বগুড়া): সোনাতলায় শুক্রবার দিবাগত রাতের ঝড়-বৃষ্টিতে ধান, মরিচসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শনিবার (১ নভেম্বর) সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, শুক্রবারের দিবাগত রাতভর প্রচণ্ড ঝড় ও বৃষ্টিতে ফসলের মাঠে পাকা ও আধাপাকা ধান বৃষ্টির পানির মধ্যে নুয়ে পড়েছে। এতে করে শত শত একর জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। পাশাপাশি আগাম জাতের মরিচ, আলু ও মাষকলাই ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে ওই এলাকার কৃষকরা জানিয়েছেন।
