ডেস্ক রিপোর্ট: অভিভাবকদের সচেতনতা ও আর্থিকভাবে খুব ব্যয়বহুল নয় এমন কিছু উদ্যোগই পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করে বাঁচাতে পারে শত শিশুর প্রাণ। এমন মতামত পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিয়ে গবেষণা ও মৃত্যু রোধে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের।
একাধিক বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিশুমৃত্যু রোধে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন, এর বেশি বয়সী শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ, ডুবে যাওয়া শিশুকে উদ্ধারের পর প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও মানুষকে সচেতন করার কর্মসূচি নেয়া যেতে পারে। এতে খুব বেশি অর্থেরও প্রয়োজন হবে না।
তারা আরও জানিয়েছেন, কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে ডে-কেয়ার সেন্টারের মাধ্যমে একটি শিশুকে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত (পরিবারের সবাই কাজে থাকায় যে সময়ে শিশু পানিতে পড়ে) নজরদারিতে রাখতে বছরে ব্যয় হবে আড়াই হাজার টাকা। একটি শিশুকে সাঁতার শেখাতে খরচ হবে সর্বোচ্চ ৯০০ টাকা।
২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ‘প্রিভেনটিং ড্রাউনিং : এন ইমপ্লিমেন্টেশন গাইড’ শীর্ষক যে নির্দেশনা দিয়েছে, যেখানে কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে ডে-কেয়ার সেন্টারের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া নীতি পর্যালোচনা ও দেশীয় পেক্ষাপট বিবেচনায় নেয়ার কথাও রয়েছে সেই নির্দেশনায়।
বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. আমিনুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে আমাদের প্রথমেই একটি জাতীয় নীতিমালা প্রয়োজন। যেন সারা দেশে একটা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া যায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য নজরদারির কাজটি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে আমাদের সাজেশন হচ্ছে, স্থানীয় লোকজনকে সম্পৃক্ত করে ডে-কেয়ার সেন্টার করা।’
তিনি বলেন, ‘এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের ডে-কেয়ার সেন্টারে রাখতে হবে। ছয় থেকে ১০ বছরের বাচ্চাদের সম্ভব হলে স্কুলের মাধ্যমে সাঁতার শেখানো।’
সিআইপিআরবির এই উপ-নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘শিশুরা পানিতে ডুবে গেলে তাৎক্ষণিক যা করা উচিত তা না করে ক্ষতিকর কিছু প্র্যাকটিস আছে আমাদের, যেমন- মাথার ওপরে নিয়ে ঘোরানো হয় বা জোর করে বমি করানোর চেষ্টা করা বা পেটে চাপ দেয়া হয়। কার্ডিও-পালমোনারি রিসাসিটেশন বা সিপিআর, সেটার বিষয়ে আমরা জানি না। এই পদ্ধতিতে মুখ থেকে মুখে শ্বাস দিতে হবে, বুকে চাপ দিতে হবে। এটা সময় মতো করা গেলে হয়তো একটা শিশুর জীবন বেঁচে যাবে।’
আমিনুর রহমান বলেন, ‘১৬ কোটি মানুষের ১০ শতাংশ বা এক কোটি ৬০ লাখ মানুষকে যদি ফার্স্ট রেসপন্স শেখানো যায়, তবে বলা যাবে কেউ পানিতে ডুবলে কেউ একজন সাহায্য করতে পারবে। এর সঙ্গে প্রয়োজন জনসচেতনতা তৈরি। সরকারের মাঠ পর্যায়ে যারা আছেন, তাদের ব্যবহার করে এই সচেতনতা সৃষ্টির কাজটি করা যেতে পারে।’বিদেশে বাচ্চাদের সাঁতার শেখানোর বিষয়টি পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানেও এটা করা যেতে পারে।’
‘আমরা আমাদের একটি হিসাবে বলেছি, একটি শিশুকে সাঁতার শেখাতে আট থেকে ১০ মার্কিন ডলার (৭০০ থেকে ৯০০ টাকা) খরচ হবে। আর একটা বাচ্চাকে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় করে সারাবছর যদি ডে-কেয়ার সেন্টারে রাখা যায় তবে মোট খরচ আসে ২৫ থেকে ৩০ ডলার। একটা বাচ্চাকে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এক বছর ডে-কেয়ারে রাখার খরচ আড়াই হাজার টাকা। সে হিসাবে দিনে ১০ টাকাও খরচ হয় না। এই সামান্য টাকায় বেঁচে যেতে পারে অনেকগুলো প্রাণ’—বলেন ইন্টারন্যাশনাল ড্রাউনিং রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশের পরিচালক আমিনুর।
২০০৫ থেকে সিআইপিআরবি পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রোগ্রামের মধ্যে রয়েছে, ডে কেয়ার সেন্টার “আঁচল”। আগামী বছর থেকে আঁচলের দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি শুরু হবে। এছাড়া সাঁতার শেখানো, ফার্স্ট রেসপন্স প্রোগ্রাম এবং সচেতনতা বৃদ্ধি নিয়েও আমরা কাজ করছি।’
‘সেভিং অব লাইভস ফ্রম ড্রাউনিং (সলিড) ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় ‘আঁচল’ বাস্তবায়িত হচ্ছে জানিয়ে আমিনুর রহমান বলেন, ‘এখন ১০টি উপজেলায় তিন হাজারের মতো আঁচল রয়েছে। প্রতিটি সেন্টারে ২০ থেকে ২৫টি শিশুকে রাখা হয়। প্রতিটি আঁচলে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ওই এলাকারই একজন নারী বাচ্চাদের দেখাশোনা করেন। তাকে আমরা বলি ‘
আঁচল মা’। এসএসসি পাস বা নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা কোনো নারী ‘আঁচল মা’ হন। তার সঙ্গে একজন সহকারী নারী থাকেন। এরা বাচ্চাদের চার ঘণ্টা দেখাশোনা করেন। এই সময়টুকু নাচ, গান, ছড়া ও গল্প বলা, ছবি আঁকা- প্রারম্ভিক বিকাশের এসব বিনোদন ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মধ্যে শিশুকে রাখা হয়।’
‘আমরা দাতাদের সাহায্য নিয়েই এই কার্যক্রম চালাচ্ছি। আঁচলে থাকা শিশু পরিবারকে কোনো অর্থ দিতে হয় না। তবে আমরা ‘আঁচল মা’কে মাসে তিন হাজার টাকা ও সহকারীকে দেড় হাজার টাকা সম্মানি দিয়ে থাকি। যিনি আঁচল মা হন তার বাড়ির একটি কক্ষে এই কার্যক্রম হয়। তবে কক্ষটি সাজানোর জন্য যা অর্থ লাগে তা প্রকল্প থেকে দেয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘যদি একটা বাচ্চা আঁচলে থাকে তবে তার পানিতে ডুবে মৃত্যুর শঙ্কা ৮০ শতাংশ কমে যায়।’ভাসা’ প্রকল্পের মাধ্যমে সাত লাখের মতো শিশুকে ইতোমধ্যে সাঁতার শেখানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সাঁতার শেখানো গেলে তা ৯৬ শতাংশ প্রোটেকটিভ, অর্থাৎ পানিতে ডুবে বাচ্চার মৃত্যুর শঙ্কা ৯৬ শতাংশ কমে যাবে।’
আমিনুর রহমান জানান, ভারত, ভিয়েতনামসহ অনেক দেশেই কমিউনিটি ও স্থানীয় সরকারকে যুক্ত করে গ্রহণ করা কার্যক্রম সফল হয়েছে। বাংলাদেশে সিআইপিআরবির কমিউনিটি ডে-কেয়ার মডেল, ‘ভাসা’ ও ‘সলিড’ এক্ষেত্রে সাফল্য এনেছে। এ মডেল বাস্তবায়ন করে বছরে আট হাজার শিশুর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব বলে সম্প্রতি প্রকাশিত জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়, আইসিডিডিআরবি ও সিআইপিআরবির যৌথ গবেষণায় জানানো হয়েছে।
