মোস্তাক আহম্মদ, সহকারি প্রধান শিক্ষক,
জয়পাড়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়।
দোহার, ঢাকা।
মানব জীবনে শিক্ষার বিকল্প নেই। সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নিকট মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সর্ব প্রথম বানী ‘ইকরা বিস্মি রাব্বি কাল্লাজি খালাক্ব’। অর্থাৎ ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন।’ মহান প্রভু তার প্রিয়তম বন্ধুর প্রতি এই গুরুত্বপূর্ণ বাণীর মাধ্যমে হেরা গুহার অন্ধকার বিদীর্ণ করে জ্ঞানের আলো স্বরূপ মহাগ্রন্থ আল-কোরআন নাজিল করেছিলেন। এতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, মহান প্রভু শিক্ষার প্রতি কতোটা গুরুত্ব আরোপ করেছেন। Education is the back bone of a nation অর্থাৎ ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড’। এই শিক্ষা সম্পর্কে আজ পর্যন্ত মনীষীগণ কোনো সার্বজনীন সংজ্ঞায় উপনীত হতে পারেননি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মনীষী, বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক নিজ নিজ দৃষ্টি ভঙ্গি দিয়ে শিক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিম্নে শিক্ষা সম্পর্কে কয়েকজন মনীষীর মতবাদ উপস্থাপন করছি।
বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘শিক্ষা হলো স্রষ্টার নিকট আত্মসমর্পন, ব্যক্তি সত্তার সংশোধন এবং সমাজের কল্যাণ বর্ধন।’
বিখ্যাত ভাববাদী দার্শনিক প্লেটোর মতে Education is the capacity to feel pleasure and pain in the right moment অর্থাৎ ‘শিক্ষা হচ্ছে সঠিক মুহূর্তে আনন্দ ও বেদনা অনুভব করতে পারার ক্ষমতা বা শক্তি।’
শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিশ্ব বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক এ্যারিস্টটল বলেছেন, Education is the creation of the sound mind in a sound body ‘অর্থাৎ সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করার নামই শিক্ষা।’
জার্মানির খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ফ্রেডারিক হারবার্ট এর মতে, Education is the development of good moral character অর্থাৎ ‘শিক্ষা হচ্ছে নৈতিক চরিত্রের বিকাশ সাধন।’
নোবেল জয়ী বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার মতে শিক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন, The highest education is that wihch does not give us information only but also makes our life in harmony with all existence অর্থাৎ ‘সর্বোত্তম শিক্ষা হচ্ছে সেই শিক্ষা যা আমাদেরকে কেবল তথ্যই পরিবেশন করেনা বরং বিশ্বস্ততার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।’
নিয়মিত অধ্যয়নের মাধ্যমে শুধু সার্টিফিকেট গ্রহণ করলেই হবেনা, আমাদেরকে হতে হবে সুশিক্ষিত মানুষ, মানব কল্যাণে আত্মনিয়োগ করে হতে হবে ধন্য। শিক্ষা একটি জীবন ব্যাপী প্রক্রিয়া। ব্যাপক অর্থে শিক্ষা এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিত্ব পরিপূর্ণভাবে বিকাশিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় ও পারিপার্শ্বিক জগতের সাথে নিজের অবস্থান উপলদ্ধি করতে সক্ষম হয়। শিক্ষা জীবন গঠনের হাতিয়ার, শিক্ষা জীবন-যাপনের হাতিয়ার, শিক্ষা সর্বোপরি মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার মাধ্যম। মানুষ গড়ার কারিগর বলে পরিচিত শিক্ষকগণ শিক্ষাদানের মতো মহান পেশায় নিয়োজিত। শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে শিক্ষকের একটি বিশিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। সমাজ বিজ্ঞানের প্রভাবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষকের ভূমিকা এখন দাতা ও নির্দেশক। ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্ক হবে সমান্তরাল সরল রেখার মতো। ছাত্র ও শিক্ষক খুব কাছাকাছি অবস্থান করবে কিন্তু কখনও পুরোপুরি মিশে যাবে না। শিক্ষক অত্যন্ত নিকট থেকে তাদের জীবন গঠনের দিক নির্দেশনা প্রদান করবেন। শিক্ষকগণের প্রতি থাকবে ছাত্রদের পরম শ্রদ্ধাবোধ। পক্ষান্তরে ছাত্ররা হবে শিক্ষকগণের স্নেহ ভাজন। বর্তমানকালে আমাদের শিক্ষা ডিগ্রী অর্জনের উপরই গুরুত্ব আরোপ করে। শিক্ষার্থী প্রকৃত গুণ লাভের জন্য শিক্ষা লাভের ব্রতী নয়। ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃত অর্থে মানবিক সম্পর্ক গড়ে উঠে না। গড়ে উঠে দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক। শিক্ষকগণ হচ্ছেন শিক্ষার্থীদের নিকট মডেল স্বরূপ। তাই শিক্ষকগণ হবেন শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত আন্তরিক ও সচেতন। শিক্ষকগণের অসচেতনতা ও আন্তরিকতার অভাবে শিক্ষার্থীগণ আলোক উজ্বল পথ থেকে সরে গিয়ে তলিয়ে যেতে পারেন অন্ধকার অতল তলে। নির্ধারিত পাঠ্যসূচী ভিত্তিক পাঠদানকে এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে যে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত অর্থেই নিজ জীবনকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, সেভাবে শিক্ষকে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের দায়িত্ব পালনকালে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে। এতে করে শিক্ষককে স্মরণ রাখতে হবে যে, বিদ্যালয়ের চার দেয়ালের ভেতরেই তার দায়িত্ব সীমাবদ্ধ নয়। এর বাইরের জীবনের সঙ্গেও যেন শিক্ষার্থী তার জীবনকে খাপ খাইয়ে নিতে শিক্ষকের নির্দেশনা ও ব্যক্তিত্বকে আর্দশ হিসেবে নিতে পারে। শিক্ষকগণ শ্রেণি কক্ষে মাঝে মাঝে উপদেশ প্রদান করবেন। মহাপুরুষের জীবনী তাদের সামনে তুলে ধরতে সচেষ্ট হবেন। সে চেষ্টাও শিক্ষকগণকে করতে হবে। কেননা, শিক্ষকতা কেবল পেশা নয়, এ পেশা এর চেয়ে বেশি কিছু, বড় কিছু, এটি একটি ব্রতও। শিক্ষকগণ যদি তাদের মহান পেশায় দক্ষতার সাথে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সংশ্লিষ্ট সকল সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করেন, তাহলে আজকের শিক্ষার্থীরাই হবে আর্দশ মানুষ, জাতির সুযোগ্য কর্ণধার, এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
