নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘ চার শতাধিক বছরের ঐতিহ্য বহন করে আসছে দোহার উপজেলার নুরুল্লাহপুরে হযরত সালাল শাহ চিশতি (রহ.)-এর ওরশ। এ বছরও ওরশের আয়োজনের অনুমতি মিলেছে। ভক্ত-অনুসারীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন যথাযোগ্য মর্যাদায় ওরশ পালনের। তবে এবার মিলেনি বহুল প্রতীক্ষিত মেলার অনুমতি। আর তাতেই হতাশা আর অনিশ্চয়তায় ডুবে গেছে মেলাকে ঘিরে জীবন-জীবিকা চালানো অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
প্রতিবছর ওরশ উপলক্ষে বসা এই মেলা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং গ্রামীণ ঐতিহ্য আর মিলনমেলার এক প্রাণকেন্দ্র। খেলনা, মাটির তৈজসপত্র, হাতের কাজের অলংকার, মিষ্টি, নাগরদোলা থেকে শুরু করে নানা দোকানে ভিড় জমাতো দূর-দূরান্ত থেকে আসা লক্ষ লক্ষ মানুষ। এতে কয়েক দিনের এই আয়েই বছরের অনেকটা সময় সংসার চালানোর স্বপ্ন দেখতেন ব্যবসায়ীরা। এবার সেই স্বপ্ন যেন শুরুতেই ভেঙে যাচ্ছে।
নুরুল্লাহপুরের পাশে বসবাসকারী লোহার ছোট ব্যবসায়ী জামশেদ বলেন, মেলার আশায় ধার করে মাল তুলেছিলাম। ভেবেছিলাম বেচাকেনা ভালো হবে। এখন সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিভাবে ঋণ শোধ করবো বুঝতে পারছি না।
একই আক্ষেপ শোনা গেল ভ্রাম্যমাণ খেলনা ও কসমেটিক বিক্রেতা রুবেল, সোহান, মামুনের কণ্ঠে। তারা বলেন, সারা বছর এই মেলার অপেক্ষায় থাকি। বাচ্চাদের নিয়ে কোনোমতে চলি। মেলা না হলে আমাদের মতো মানুষের ঘরে চুলা জ্বলবে কিভাবে? আমরা সরকারের কাজে আবেদন করছি স্বপ্ল পরিসরে হলেও মেলার অনুমতি দেওয়া হোক।
বিভিন্ন এলাকায় থেকে আসা হোটেল মালিক হিরো ও নিমকি দোকানদার প্রদিপ বলেন, আমরা এই মেলা করে সাড়া বছরের পুজি জোগাই। কিন্তু এই বছর যদি মেলা না হয় আমাদের কি হবে। এই মেলা আমাদের সংসার চালানোর সঙ্গী।
স্থানীয়দের মতে, ওরশ আর মেলা যুগ যুগ ধরে একসঙ্গেই হয়ে আসছে। তাই হঠাৎ মেলার অনুমতি না মেলায় অনেকেই বিস্মিত। আমরা বিগত দিনে দেখেছি মেলা উপলক্ষে প্রশাসনের ওয়াচ টাওয়ার তৈরি হতো। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্য সুষ্ঠ ভাবে মেলা পরিচালিত হতো।
এব্যপারে শাহসুফী ফকির সজীব শাহ চিশতী ও আয়োজক সংশ্লিষ্টরা জানান, ওরশের ধর্মীয় অংশ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে। তবে মেলার অনুমতি না পাওয়ায় হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তারা।
এদিকে মেলার অনুমতি না পাওয়ায় এলাকা জুড়ে নীরব বিষণ্নতা লক্ষ করা যাচ্ছে। যেখানে থাকার কথা ছিল রঙিন আলোর ঝলকানি, মেহমানদের আনন্দ উৎসব, শিশুদের হাসি আর বিক্রেতাদের হাক, ডাক, সেখানে এখন শুধুই অনিশ্চয়তার ছায়া। দীর্ঘ এক বছর পর নুরুল্লাহপুরের এই ঐতিহ্যবাহী ওরশ মানুষকে একত্র করে। কিন্তু মেলা ছাড়া সেই আনন্দ যেন অপূর্ণই থেকে যাবে। আর হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চোখের জল নীরবে মনে করিয়ে দিচ্ছে, একটি সিদ্ধান্ত কত শত মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।
