তামাকমুক্ত দেশ গড়ার রোডম্যাপ তৈরি

ডেস্ক নিউজ : আগামী ২০২২ সালের মধ্যে তামাকের ব্যবহার প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপসহ দেশকে তামাকমুক্ত করার রোডম্যাপের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। অন্যান্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান আইন বাস্তবায়ন, আইন সংশোধন, তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ, স্কুলের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধকরণ, সব তামাক কোম্পানির ডাটাবেজ তৈরি করা, ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে তামাকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক কারিকুলামে তামাক সম্পর্কে অন্তর্ভুক্ত করা ইত্যাদি। আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে তামাকমুক্ত।

২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারি এশিয়ান স্পিকার্স সামিটের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ঘোষণা দেন। আর সে ঘোষণা ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার রোডম্যাপের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। আর এই রোডম্যাপ চূড়ান্ত করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছে মতামত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই মতামত পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

খসড়া রোডম্যাপ অনুযায়ী বিদ্যমান আইন বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ করা হয়েছে, সব হাসপাতাল, ক্লিনিক, স্কুল শতভাগ ধূমপানমুক্ত করা সংক্রান্ত ধারার কঠোর বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। আর সে অনুযায়ী হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পরোক্ষভাবে ধূমপান ৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। স্কুলে ৫ শতাংশ, কর্মক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ, পাবলিক পরিবহনে ২০ শতাংশ, সরকারি অফিসে ১০ শতাংশ, রেস্টুরেন্টে ৩০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। আর আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সব ধারায় জরিমান বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। খসড়া রোডম্যাপে উল্লেখ করা হয়েছে, তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা অনুমোদনসহ তামাক চাষের জমি কমিয়ে আনতে পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি করা হবে। পাশাপাশি বৃক্ষের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে। ২০২৩-২৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা থেকে শুরু করে একেবারে ২০৩৭-৩৯ সাল পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার কর্মপরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

২০১৯ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী সারাবিশ্বে বছরে ১২ লাখের বেশি মানুষ মারা যায় শুধু ধূমপানের কারণে বিভিন্ন রোগে। আর গ্লোবাল ইয়ুথ টোব্যাকো জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ তামাক সেবন করে। ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ৩০ বছরের বেশি বয়সের অনেক মানুষ বর্তমানে তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ মারা যায় তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে।

জানা গেছে, ব্রিটিশ প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ১৮৯০ সালে রেলওয়ে আইনে প্রথমে রেলের কামরায় ধূমপান নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯১৯ সালে জুবিনাইল অ্যাক্টের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের কাছে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৫২ সালে সিনেমা হলে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে আইনের মাধ্যমে পাতার বিড়ি উৎপাদন নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৭৬ সালে প্রথমে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ আইনে ধূমপান নিয়ন্ত্রণের বিধান যুক্ত করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে অন্যান্য মেট্রোপলিটন পুলিশ আইনে যুক্ত করা হয়। ১৯৮৮ সালে প্রথমে সিগারেটের মোড়কে লিখিত স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা প্রদানের বিধান যুক্ত করা হয়। 


জানা গেছে, তামাক ব্যবহারজনিত ভয়াবহতা কমিয়ে আনতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক তামাক নিয়ন্ত্রণ চুক্তি চূড়ান্ত করে। বাংলাদেশ এ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী প্রথম দেশ। ২০০৪ সালে সরকার ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন পাস করে। কিন্তু সে সময় এই আইনে ধোঁয়াবিহীন তামাককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

খসড়া নীতিমালায় তামাকের ব্যবহার কমাতে প্রতিবছর তামাকজাত দ্রব্যের ওপর কর বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। যেন মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি হয়। একই সঙ্গে গুল-জর্দার বিক্রিমূল্যের ওপর কর আরোপ করার বিষয়টি প্রস্তাব রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। তামাকের ওপর যেন আসক্তি কমে যায় এ ব্যাপারে কাউন্সেলিংয়ের জন্য উল্লেখ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *