কোন পথে বিএনপি

* ভবিষ্যৎ গন্তব্য নিয়ে অন্ধকারে নেতাকর্মীরা * অনিশ্চয়তায় খালেদার মুক্তি * অনুমতির বেড়াজালে আন্দোলন কর্মসূচি * দল পুনর্গঠনে জটিলতা * শীর্ষ নেতৃত্বে আস্থাহীনতা দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপির ভবিষ্যৎ গন্তব্য নিয়ে চরম অন্ধকারে সাধারণ নেতাকর্মীরা। দুর্নীতির দুই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব আর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রবাস জীবনের সমাপ্তি নিয়ে যেমন দলটির সংশ্লিষ্ট মহলে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে তেমনি দলটির বর্তমান সাংগঠনিক কর্মকা- নিয়েও খোদ শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা ক্ষোভ, অসন্তোষ ও আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। দলটির বর্তমান কর্মকা-র সমালোচনা করে সম্প্রতি শীর্ষ দুই নেতার পদত্যাগের পর বিষয়টি প্রকাশ্য আলোচনায় আসে। সূত্রমতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে বিএনপি জোট ওই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলেও পরবর্তী সময় আবার সংশ্লিষ্ট এমপিদের সংসদে যোগদানের মধ্য দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে দলটি। তাছাড়া সমালোচনার মধ্যেই বর্তমান সংসদের মেয়াদ এক বছর হতে চললেও আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে এখনও কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেনি বিএনপি। নানা জটিলতার কারণে খালেদার মুক্তি আন্দোলন বা দল পুনর্গঠন কাজেও সফল হতে পারছে না দলটি। বিএনপি সংশ্লিষ্ট ২০ দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের তৎপরতা নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় জাতীয় কাউন্সিল ডেকে শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন করে আগামী দিনের করণীয় ঠিক করার পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে। বিএনপির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার মঙ্গলবার বলেন, বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে পর্যালোচনার জন্য দলের একটি কাউন্সিল ডাকা জরুরি। কাউন্সিলে সবার মতামতের ভিত্তিতে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ কাউন্সিল হতে হবে প্রয়োজনে দুই থেকে তিন দিন মেয়াদি। ফটোসেশন বা বিরিয়ানি খাওয়ার কাউন্সিল নয়। জেলা পর্যায়ের নেতাদের সবার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ রাখতে হবে। দলকে পুনর্গঠনের জন্য কাউন্সিলটা জরুরি। তাছাড়া খালেদা জিয়াকে মুক্ত করাও এখন বিএনপি নেতাদের প্রধান দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন তিনি। দলীয় সূত্রমতে, ২০০৮ সালের পর থেকে টানা তিনবারের মতো ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। এ সময়ের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালসহ নানা ইস্যুতে আন্দোলন করেও ব্যর্থ হয় বিএনপি। আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি জোট ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করলেও শেষ মুহূর্তে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই ২০১৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নেয় দলটি। তবে এতে ভরাডুবির পর বিএনপি জোটে চরম হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া এ নির্বাচনে ভোট ডাকাতির অভিযোগে ফল বাতিলের দাবি জানালেও এক পর্যায়ে তা থেকে নমনীয় অবস্থানে চলে আসে দলটির নির্বাচিত এমপিদের সংসদে যোগদানের মধ্য দিয়ে। দল ও ফ্রন্টের সিদ্ধান্তের আগে তিনজন এবং পরবর্তী সময় আকস্মিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বাকিদের শপথ নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা সমালোচনা দেখা দেয়। শুধু তাই নয়, বর্তমান সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও কিছুদিনের মধ্যে সে অবস্থান থেকেও সরে আসে বিএনপি। বগুড়া ও রংপুর উপনির্বাচনে অংশ নেয় দলটি। আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। এদিকে দীর্ঘদিনেও আইনগতভাবে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে দলটি। এ ইস্যুতে আন্দোলনের ঘোষণা দিলেও তার কোনো ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারছে না দলটি। প্রশাসনের অনুমতির বেড়াজালে ও হামলা-মামলার ভয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়ছেন নেতাকর্মীরা। সর্বশেষ সোমবার পেঁয়াজসহ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সারা দেশে কর্মসূচি দিলেও তা ঢিলেঢালাভাবে পালিত হয়। এমনকি অনুমতি না পাওয়ায় ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কর্মসূচি থেকে সরে এসে থানায় থানায় নামেমাত্র এ কর্মসূচি পালন করে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি। দলের বর্তমান আন্দোলনের গতি-প্রকৃতির প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন খোদ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বিএনপির আন্দোলন দুই ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। একটি প্রেসক্লাবকেন্দ্রিক আন্দোলন, সংবাদ সম্মেলন এবং আরেকটি বিএনপি কার্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন। বর্তমানে বিএনপির রাজনীতি হয়ে উঠেছে আত্মরক্ষামূলক রাজনীতি। এ মানসিকতা বাদ দিয়ে আক্রমণাত্মক রাজনীতি করলে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার বিষয়ে বিএনপির এ নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি সাতটি দফা দিয়েছিল। এক দফা দাবি খালেদার মুক্তি যদি চাইতাম তাহলে খালেদার মুক্তি না হয়ে যেত না। নির্বাচনের ফল যে এমন হবে এটা তো আমরা আগে থেকেই জানতাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো আমাদের দাওয়াত দেননি। ড. কামাল হোসেন দাওয়াত চেয়েছেন। চেয়ে দাওয়াত নিলে সেখানে অতিথি আপ্যায়নও তেমনি হয়। এদিকে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের নানা সমালোচনা করে সম্প্রতি দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোর্শেদ খান পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পরদিন মোর্শেদ খান গণমাধ্যমে বিএনপির পরিচালনা পদ্ধতি ও নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনা করে বলেন, বিএনপি এত বৃহত্তম একটা দল, এক বিশাল জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা জনমানুষের কাছে। সেই দলটি এখন স্কাইপের মাধ্যমে চলছে; এটা এখন ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্কাইপ দল’ হয়ে গেছে। এটা বেদনার, এটা ক্ষোভের। মোর্শেদ খানের মতো গণমাধ্যমে নানা অভিযোগ করলেও বয়সের কারণে লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান পদত্যাগ করেছেন বলে পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন। তবে এর পেছনে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে মতবিরোধসহ নানা কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অনুপস্থিত থাকতেন। অবশ্য বিএনপিতে তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের এসব অসন্তোষের গুঞ্জনের মধ্যেও তার প্রশংসা করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সোমবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, আমাদের নেতা তারেক রহমান অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিএনপিকে গোছানোর কাজ প্রায় শেষ করে নিয়ে এসেছেন, নতুন প্রাণ সৃষ্টি করেছেন বিএনপির মধ্যে। এ দুঃসময়ে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে তিনি দলকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। তবে বিএনপির বর্তমান কর্মকা-ের সমালোচনা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মঙ্গলবার আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, বিএনপি তো ঘুমাচ্ছে। দলের স্থায়ী কমিটির নেতাদের বেশিরভাগ বয়স্ক। তাদের ভেতরে একটা স্থবিরতা বিরাজ করছে। তারা অজুহাত খুঁজতে ব্যস্ত। তাদের জন্য ভালো অজুহাত আছে যে, ‘অহি’ আসেনি। নিজেরাও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায় না। ঘরোয়া কর্মসূচিতে ব্যস্ত দলটি। নেতাদের মধ্যে আস্থাহীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিএনপিকে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার বিষয়টি তুলে ধরে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সরকার কোনো রাজনৈতিক কর্মকা-ই করতে দিচ্ছে না। বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে শত শত মামলা-হামলা দিয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছে। কোর্টে দৌড়াতে দৌড়াতে সময় পার করছেন নেতারা। তিনি বলেন, সরকার ক্যাসিনো, শুদ্ধি অভিযান, ডাক্তারদের গ্রামে যাওয়া ইত্যাদির নামে একের পর এক ম্যাজিক দেখাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এসব ম্যাজিক ক্ষণস্থায়ী। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এ অবস্থার পরিবর্তন হবেই। এভাবে তো দেশ চলতে পারে না। তবে কবে কে বা কারা পরিবর্তন করবে তা জানি না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *