বর্তমানে ৪৪ বছর চলছে আমার। আমি একজন বাংলাদেশি নারী। জ্বী। আজকে আমি আমার নিরাপত্তার জন্য শংকিত। একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র আজকে আমার মত কোটি নারীর নিরাপত্তা দিতে পারছে না। এই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সদ্য জন্ম নেয়া কন্যা শিশু থেকে মৃত্যু পথযাত্রী বৃদ্ধ নারীটিও। না। একদম অবাস্তব কথা বলছি না। নারীরা আজ কোথাও নিরাপদ নেই। না ঘরে, না উপসনালয়ে, না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। পিতা কর্তৃক কন্যা ধর্ষণ, ধর্ম যাজকের হাতে নারী উপসনাকারী ধর্ষণ, বিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ চলছে। গোটা দেশে চলছে ধর্ষণের উৎসব।
একজন নারীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে আনন্দে উল্লাসের সাথে সেই নারীর যৌনাঙ্গে হাত ঢুকানো, লাঠি ঢুকানোর মত নিষ্ঠুর নির্যাতনও চলছে। সেই আনন্দের ক্ষণকে স্মরণীয় করতে ক্ষমতাবান পুরুষেরা আবার ভিডিও করে রাখছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হবার লোভে সেইসব ভিডিও পোস্ট করা হচ্ছে। সত্যি, কী চমৎকার আমাদের সমাজ, মানসিকতা।
দেশে কিছু আইন আছে। একটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় আছে, কিছু দায়িত্ববান ব্যক্তি আছেন। আমরা আসলেই জানি না তারা কেন আছেন বা কী তাদের ভূমিকা। কোথায় তারা ব্যস্ত আছেন, কী তাদের প্রায়োরিটি। থানায় থানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ কী? এলাকায় কোন অপরাধ সংগঠিত হলে সেই খবর কেন তাদের কাছে পৌঁছায় না? পুলিশের সোর্সগুলো কি সব অচল? ঘটনা ঘটলো সেপ্টেম্বরের ২ তারিখে অথচ প্রশাসনের টনক নড়লো যখন ফেসবুকে ভিডিও ছড়িয়ে পড়লো আর মানুষ প্রতিবাদ করা শুরু করলো তখন।
৩২ দিনের মধ্যে তাহলে কেউই জানতে পারেনি এই ঘটনা? নাকি জেনেও চুপ ছিলো? যদি না জেনে থাকলে তাহলে কেন জানতে ব্যর্থ হলো স্থানীয় পুলিশ? কেন অপরাধীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হলো না? সংবাদে জানা যায়, ঘটনার পরই নির্যাতিত নারী একলাসপুর ইউনিয়নের কর্তাব্যক্তিদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। ঘটনা কারা ঘটিয়েছে সেটিও জানেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। হাস্যকর হলেও সত্য যে তিনিও এই ঘটনাকে বর্বর বলেছেন এবং বিচার চেয়েছেন। তাহলে প্রশ্ন করতেই হয় যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হিসেবে তিনি কী ভূমিকা পালন করেছিলেন ঘটনা জানার পর? কেন তিনি আইনী ব্যবস্থা নেন নি?
এমন হাজারো প্রশ্ন করা যায় কিন্তু জানি করেও লাভ আসবে না। যতগুলো ঘটনায় অপরাধীরা ধরা পড়েছে তার বেশিরভাগই কোন না কোনভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত হবার পর। অর্থাৎ, মানুষ না জানলে সেটি আর অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে না। কিন্তু কেন? বাংলাদেশ একটি সভ্য রাষ্ট্র। এর সংবিধান আছে, আইন আছে, প্রশাসন আছে। আছে জনগণের কাছে জবাবদিহিতা কারণ এ দেশটির মালিক জনগণ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সবকিছু মালিক এই জনগণ যার অর্ধেক হচ্ছে নারীরা। অথচ এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অবহেলা করেই এগিয়ে চলতে চাইছে বাংলাদেশের আইন ও প্রশাসন। এভাবে কি চলতে পারে না চলতে দেয়া যায়?
এদেশের প্রধান প্রধান প্রশাসনিক পদে আসীন আছে অনেক নারী। প্রধানমন্ত্রী নিজেও একজন নারী এবং তিনি নারীর প্রতিটি ইস্যুতে অত্যন্ত আন্তরিক বলেই জানি। আমাদের একমাত্র ও শেষ আশার স্থল তিনিই আছেন। আজ আমরা নারীরা একা চলতে ভয় পাই। অপরাধের মাত্র আজ এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে ধর্ষণ ও নির্যাতন করে সেটিকে আবার ভিডিও করে ছেড়ে দেয়ার মত সাহস দেখাচ্ছে অপরাধীরা।
এই ঘটনাকে কতটা যৌক্তিক মনে করছেন আমাদের কর্তারা? আমিতো মনে করি এটি সমস্ত প্রশাসনের প্রতি এক প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জ। অপরাধীরা দেখিয়ে দিতে চাইছে, দেখো, আজ আমরা কতটা সাহসী। তোমাদের কাউকেই আমরা ভয় পাইনা। আমাদের রাজ্যে আমরাই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করি। তোমাদের কারও কিছু করার ক্ষমতা নেই। এলাকায় এলাকায় গ্যাং, বাহিনী গড়ে তুলে গোটা দেশকে তারা সন্ত্রাসের রাজ্য বানিয়ে ফেলতে চাইছে। নোয়াখালীর এই ঘটনাতেও উঠে এসেছে একটি বিশেষ বাহিনীর নাম। সেই বাহিনীর নেতা দেলোয়ারের নেতৃত্বে ঘটনা ঘটলেও আসামীর তালিকায় নেই তার নাম। আমরা জানিনা এর পিছনে কারণ কী। কারা রক্ষা করতে চাইছে অপরাধীকে।
এমন ঘটনায় যদি দেশ জেগে না উঠে তাহলে বুঝতে হবে এ রাষ্ট্র, এ প্রশাসন এদেশের নারীদেরকে অপাঙক্তেও ভাবছে। নারীর প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করতে চাইছে তারা। আমার সাংবিধানিক অধিকারকে যারা অস্বীকার করে আমিও তাদেরকে অস্বীকার করতে চাই। জবাবদিহিতাকে নিশ্চিত না করতে পারলে কোন প্রশাসনই ঠিকমত কাজ করবে না। আজ একলাসপুরের আমার সেই বোনটি উলঙ্গ নয় কেবল, উলঙ্গ হয়েছে আমি আপনি সকলে, গোটা বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশকে বাঁচাবে কে?
