এডভোকেট মনির হোসেন রানা: আধুনিক দোহারের স্থপতি, দোহার থেকে বহুবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য, বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা’র স্ত্রী হিসেবে দোহার নবাবগঞ্জ অঞ্চলের অনেকের সাথেই সিগমা হুদার ভালো সম্পর্ক ছিল এবং তিনি মানুষের মূল্যায়ন বুঝতেন, ছিলেন মানবিক মনের এক মহীয়সী নারী।
রাজনৈতিক সম্পর্ক আর ঘনিষ্টার মধ্য দিয়েই ৩০ বছরেও অধিক সময় আগে তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনে মধ্য দুপুরে সিগমা ভাবীর সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলবার সুযোগ হয়ে যায়। হুদা ভাই তখন পদত্যাগী তথ্যমন্ত্রী এবং কিছুটা অভিমান নিয়ে বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বপ্নের চেয়েও বড় উচ্চতার মহীয়সী মানুষটির সাথে যতোই কথা বলছি আমার বিমুগ্ধতা ততোটাই বেড়ে যাচ্ছে। বাংলা আর শুদ্ধ উচ্চারণের নিরেট ইংরেজীতে তিনি কথা বলে যাচ্ছেন, আর আমি ঘোরের মধ্যে বসে শুনে যাচ্ছি তাঁর কথা। মাঝে মধ্যে নিজ গাঁয়ে চিমটি কেঁটে দেখছি, এ স্বপ্ন নয়তো!
তাঁর বাবা আকবর কবির রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি ফিরে গেলেন তাঁর যৌবনকালের স্মৃতি ঘেরা লাহোর করাচীর জীবনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আর তাদের পাশাপাশি থাকবার কিছু স্মৃতির স্মরণও করলেন।
এরশাদীয় যুগে তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে ৭ দলীয় জোটের অনেক বিশেষ সভার আয়োজন হতো বললেন সেই কথাও। নিরাপত্তার প্রয়োজনে গোয়েন্দা নজরদারী এড়িয়ে ম্যাডাম জিয়াকে তাঁর নিজ গাড়ীতে পৌঁছে দেবার হিরম্নয় স্মৃতিও তুলে ধরলেন। কপট রাগ দেখালেন স্বামীর উপর, “রিন্টূ স্থির থাকবে না।”
জানতে চাইলাম তাঁর বড় চাচা মেধাবী কংগ্ৰেস নেতা, স্বাধীন ভারতের ১ম প্রধানমন্ত্রী নেহেরু মন্ত্রী পরিষদের সদস্য হুমায়ুন কবির সম্পর্কে। তাঁর চাচার উদারতার কথা বললেন, একফাঁকে জেনে গেলাম তাঁর চাচাতো ভাই ভারতের প্রধান বিচারপতি আলতামাস কবির সম্পর্কে, একটুখানি কথাও হলো।
এবার তাঁর আর হুদা ভাইয়ের প্রেম ভালবাসা বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই, হেসে বললেন, জানো রানা, আমি তোমার দাদা’র জুতো দেখে ওকে পছন্দ করে ছিলাম!
এবার একটু দম নিয়ে বসলাম, শুনবো সেই রোমান্টিক কাহিনী!
পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টে সিগমা কবির সুন্দরী, আধুনিকতা আর পেশায় আলোচিত লিজেন্ড হিরোইন, দেশসেরা অনেক যুবকের স্বপ্নের রানী। সেই সিগমাকে ড. জহির (প্রয়ত: বরেণ্য আইনজীবী) বললেন, সিগমা ব্যারিস্টার হুদা’কে তুমি দেখতে পারো। তিনি স্থির করলেন তিনি দেখবেন তবে সবার আগে দেখবেন হুদা’র পায়ের জুতোর অবস্থা।
একটুখানি টিপ্পনী কেঁটে বললাম সবরেখে জুতা!
প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, মহীয়সী নারী মৃদু হেসে বললেন, তোমরা পুরুষেরা নারীকে অবজ্ঞা করো, যেমনি অবজ্ঞা করো পায়ের জুতোকে। রিন্টূ যদি জুতার যত্ন নেয়, ধরে নিবো ও বউয়ের যত্ন নিবে।
হুদা ভাই পাশ করেছিলেন। তাদের সেই প্রেম ভালোবাসা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অটুট ছিল।
এ প্রসঙ্গে ছোট্ট একটু স্মৃতি তুলে ধরছি।
হুদা ভাই’র মৃত্যুর মাস তিনেক পর ভাবীকে ফোন করছি চিরচেনা কন্ঠে শুদ্ধ সুন্দর উচ্চারনে জানতে চাইলেন, রানা তুমি কোথায়? আমি ধানমন্ডি, বলতেই তিনি তাঁর বাসায় আসতে বললেন। কথার ফাঁকে তিনি বললেন, জানো রানা, রিন্টূ’র বাথরুমের তোয়ালেটা দেখলে সহ্য হয় না, কখন যে রিন্টূ’র কাছে যেতে পারবো!
বিধাতা তাঁর আকুতি রেখে দিলেন, এক বছরের ব্যবধানে তিনি চলে গেলেন তাঁর রিন্টূ’র কাছে।
কানে সেই শব্দ আজো বাঁজে, চোঁখের জলে ভাসি…….এমনই ভালোবাসার জোড়!
১৯৯৬ সনের আওয়ামী শাসন আমলে হুদা ভাই’র মতিঝিল চেম্বারে ভাইর সামনের চেয়ারে বসে আছি, রাজনীতি নিয়ে টুকটাক কথা হচ্ছে। হঠাৎ কেন যেন ভাবীর প্রসঙ্গ এলো। আমি বললাম ভাবী নাকি আপনাকে জুতো দেখে পছন্দ করেছিল!
হুদা ভাই ইন্টারকমে ভাবীকে আসতে বললেন।
রুমে ঢুকেই ভাবী আমাকে দেখে বললেন, এই রানা তুমি নাকি অনেক আগেও ল’ পাশ করেছো। সনদ নিচ্ছো না কেন? জলদী সনদ নাও।
এবার মূল কথা শুরু হলো শুনলাম তাদের প্রেমময় জীবনের অনেক কাহিনী।
ঐ মহীয়সী নারী আমাকে উকিল বানালেন, মায়ের স্নেহ, বোনের ভালোবাসা, শিক্ষকের শাসন আর জীবন চলার আদর্শ হয়ে পথ চলতে শেখালেন।…………….
যদি প্রশান্ত মহাসাগরের সবটুকু জল তাঁর পায়ে ঢেলে কৃতজ্ঞার শেষ টানতে চাই। জল ফুরিয়ে যাবে আমার কৃতজ্ঞার শেষ হবে না। বিধাতা ও’পারে আপনাকে ভালো রাখবেন। নিশ্চয়ই আপনার রিন্টূ আপনার সাথেই থাকবে। ১৮ জুলাই, ২০২৫ইং।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীট কোর্ট।
সভাপতি, প্রবাসী কল্যাণ আইনজীবী সমিতি ।
