ঠাকুরগাঁওয়ে এক ব্যক্তির হাতে ৫২ হাজার তালগাছ, হারিয়ে যাওয়া উদ্যোগের মাঝেও নজির

হাসিনুজ্জামান মিন্টু, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দেশে কয়েক বছর আগে তালগাছ রোপণের যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তার অনেক উদ্যোগই সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। সরকারি-বেসরকারি নানা কর্মসূচিতে হাজার হাজার চারা লাগানো হলেও অধিকাংশ স্থানে সেগুলোর আর অস্তিত্ব নেই। তবে ঠাকুরগাঁওয়ের এক ব্যক্তি একাই ৫২ হাজারের বেশি তালবীজ ও চারা রোপণ করে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত গড়েছেন।

সদর উপজেলার পাহাড়ভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা খোরশেদ আলী দীর্ঘদিন ধরে নিজ উদ্যোগে তালবীজ সংগ্রহ করে বিভিন্ন স্থানে রোপণ করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, জেলার বিভিন্ন সময়ে লাগানো অধিকাংশ তালগাছ নষ্ট হয়ে গেলেও খোরশেদ আলীর লাগানো গাছগুলো এখনো টিকে আছে এবং অনেক জায়গায় বড় আকার ধারণ করেছে।

বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে উঁচু আকৃতির তালগাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—এমন ধারণা থেকেই কয়েক বছর আগে বিভিন্ন সংস্থা তালগাছ লাগানোর কর্মসূচি হাতে নেয়। ঠাকুরগাঁওয়েও কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও সেগুলোর বেশিরভাগই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

২০২৩ সালে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির আওতায় বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়কের পাশ ও খোলা জায়গায় প্রায় এক হাজার তালগাছের চারা লাগানো হয়। স্থানীয়রা আশা করেছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যে এসব গাছ বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে। কিন্তু পরিচর্যার অভাব, গবাদিপশুর আক্রমণ ও তদারকির ঘাটতিতে অধিকাংশ চারা নষ্ট হয়ে যায়।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হরিপুর ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় বজ্রপাত প্রতিরোধ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পে প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর আওতায় বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপন এবং খোলা ফসলি মাঠের পাশে কৃষকদের জন্য আশ্রয়ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে।

জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আফাজ উদ্দিন জানান, দুর্যোগের সময় মাঠে কর্মরত কৃষকদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খোরশেদ আলীর মতে, শুধু চারা লাগালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। গাছ বড় হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত যত্ন না নিলে অধিকাংশই টিকে থাকে না। তিনি বলেন, “বছরের পর বছর ধরে তালবীজ সংগ্রহ করে লাগাচ্ছি। যতটা পারি নিজেই দেখভাল করি। মানুষ যদি নিজেদের উদ্যোগে কিছু গাছ লাগিয়ে পরিচর্যা করে, তাহলে পরিবেশ রক্ষা ও বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে তা কাজে আসবে।”

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম জানান, কৃষি বিভাগের উদ্যোগে গত বছর ৪৫০টি তালগাছ রোপণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় আরও প্রায় পাঁচ হাজার তালগাছ লাগানো হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বড় প্রকল্পের চেয়ে টেকসই পরিচর্যাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, খোরশেদ আলীর উদ্যোগ দেখিয়েছে—ব্যক্তিগত আগ্রহ ও নিয়মিত যত্ন থাকলে তালগাছ শুধু টিকে থাকেই না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

বজ্রপাতপ্রবণ কৃষিপ্রধান জেলা হিসেবে ঠাকুরগাঁওয়ে এমন উদ্যোগ আরও ছড়িয়ে পড়লে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জননিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *