নিজস্ব প্রতিনিধি : মহামারিকালে ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি ও চিকিৎসা নিয়ে সময় নিউজের সাপ্তাহিক আয়োজন ‘বদ্যি বাড়ি’তে কথা বলেছেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। এদের একজন হলেন- মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান।
সাধারণত এটা ডেঙ্গু জ্বরের সময়। তবে এবার বেশি হওয়ার কারণ হলো বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি। এই বছর মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয় আবার রোদ ওঠে। ফলে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকে, যেখানে এডিস মশা ডিম পাড়ে। কিন্তু যদি মুষলধারে বৃষ্টি হতো তাহলে এ সমস্যা হতো না বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ।
তার মতে, ‘এডিস মশা গৃহপালিত মশা, এরা সুন্দর ঘরে থাকতে পছন্দ করে। ফলে এই মশা ঘরে চলে যায় যেখান থেকে ডেঙ্গু জ্বর হচ্ছে।’
একদিকে করোনা অন্যদিকে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। করোনার কারণে হাসপাতালের শয্যা এমনিতেই খালি নেই। তার ওপর ডেঙ্গু আক্রান্তরা হাসপাতালে আসায় নাজেহাল অবস্থা হাসপাতালগুলোর। অধিকাংশ হাসপাতালই ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নিতে চাচ্ছে না। কারণ, করোনা এবং ডেঙ্গু যদি পাশাপাশি রাখা হয় তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
একইমত পোষণ করলেন ডা. এবিএম আবদুল্লাহ। বলেন, ‘তবুও সরকার কিছু কিছু হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় ডেঙ্গু রোগীর পরীক্ষা করতে গিয়ে করোনা ধরা পড়ারও নজির আছে।’ আগামী দিনে যেভাবে করোনা-ডেঙ্গু বেড়ে যাচ্ছে তা আতঙ্ক বাড়াবে বলেও মত তার।
এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে এরইমধ্যে রাজধানীতে এডিসের লার্ভা নিধনে নেমেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। কিন্তু এতেও খুব একটা ফল আসছে না। এমনকি জরিমানার পরিমাণ দ্বিগুণ করা হলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। ফলে সচেতনতাতেই বেশি জোর দিচ্ছেন সিটি মেয়রসহ কর্মকর্তারা। এজন্য জনপ্রতিনিধিদেরও সম্পৃক্ত বাড়ানো হচ্ছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান বলেন, ‘গত বছর অভিযান চালানোকালে যেসব বাড়িতে জরিমানা করা হয়েছিল ওই পরিসংখ্যান ধরে এবার ১ হাজার ৭২০টি বাড়িতে পূর্ব সতর্কতা হিসেবে মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়েছে। তবুও এবার কিছু কিছু বাড়িতে এডিসের লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। ফলে এ বছর আরও বেশি জরিমানা করা হচ্ছে। কিন্তু জরিমানা উদ্দেশ্য না, সচেতনতা বৃদ্ধি করাই মূল উদ্দেশ্য বলে জানান এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।’ এতে ৮০ শতাংশ এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস হবে বলেও জানান তিনি।
তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির সফলতা বেশ ইতিবাচকভাবেই চিন্তা করছেন তারা। বলেন, ‘আমরা ১০০ জনকে বলছি, ১০ জন হয়তো মানছে। কিন্তু এটা আস্তে আস্তে বাড়ছে। একদিনে সবাইকে সচেতন করা সম্ভব না। আমরা কখনো নিরাশ হই না।’
ডেঙ্গু এবং করোনার প্রধান লক্ষণ জ্বর। ফলে দুটিকে আলাদা করতে বেশ কিছু বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে বলেন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ। বলেন, ‘ডেঙ্গুতে শরীর অনেক ব্যথা হয়, যেটাকে বলে হাড় ভাঙা জ্বর। আবার জ্বরের চার-পাঁচ দিন পর শরীরে র্যাশ হয়, রক্তের প্লাটিলেট কমে যায়। এতে রক্তক্ষরণ হয়। ফলে দাঁত ব্রাশ করলে রক্ত আসে, বমি হয়, পায়খানা কালো হয়, নির্দিষ্ট সময়ের আগে পিরিয়ড হয়।’
‘করোনার লক্ষণও প্রায় একই রকম। তবে একটু পার্থক্য আছে। কোনো কিছুর ঘ্রাণ পায় না। যদিও এটা সবার হয় না। ফুসফুসে আক্রান্ত হয় বলে শ্বাসকষ্ট হয়। অক্সিজেন লেভেল কমে যায়। শরীরের এমন কোনো অঙ্গ নেই যেটাতে করোনা আক্রান্ত না করে।’ তবে বিষয়টি নিয়ে খামখেয়ালি না করে চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়ার উপদেশ দেন এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।
ডেঙ্গু পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে থাকলেও এর কোনো প্রতিষেধক এখনও তৈরি হয়নি। ডেঙ্গুতে চার রকমের ভাইরাস থাকে বলেই এটির প্রতিরোধে বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিন তৈরি করতে পারছে না বলে জানান ডা. এবিএম আবদুল্লাহ। বলেন, এক ভাইরাসে প্রথম বার আক্রান্ত হলে অন্য যে কোনো ভাইরাসে পরের বার আক্রান্ত হতে পারে। এক ভাইরাস আরেক ভাইরাসকে প্রতিরোধ করে না। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিন তৈরি করতে পারছে না। কারণ, এমন কিছু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না যা, ডেঙ্গুর চারটি ভাইরাসকেই একসাথে প্রতিরোধ করতে সক্ষম।’
