নিজস্ব প্রতিবেদক: সৌদি আরবে গত ২ সেপ্টেম্বর নির্যাতনের শিকার হয়ে নাজমা বেগম (৪০) নামে এক নারীকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার ইসলামনগর গ্রামের মৃত দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামী দেলোয়ারের মৃত্যুর পর দুই ছেলে সন্তান নিয়ে নাজমা বেগমের দিন কাটছিল অভাব অনটনে। তখন পার্শ্ববর্তী রাজেন্দ্রপুর গ্রামের আয়নাল হকের ছেলে আদম দালাল সিদ্দিকুর রহমান তাকে বিদেশে যাওয়ার প্ররোচণা দেন। তার কথা মতো পরিবারের স্বচ্ছলতা ঘোচাতে ও দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে গত বছরের শেষের দিকে সৌদি আরবে যান নাজমা। আর সেখানেই তার মৃত্যু হয়। এদিকে মৃত্যুর পাঁচ মাস ধরে তার মরদেহটি দেশটির আরা এলাকার একটি সরকারি হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে রয়েছে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে নাজমা বেগমের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার কয়েকটি অডিও ক্লিপে শুনা যায়, নাজমা তার ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছেন আর কান্নাকাটি করছেন। তিনি প্রচণ্ড অসুস্থ। ব্যথায় উঠতে পারছেন না। কিন্তু তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। আরও একটি অডিওতে শোনা যায়, তাকে বাসা থেকে কোথায় যেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বলছেন, আমাকে আর বাঁচাতে পারলি না তোরা। আমাকে আর জীবিত পাইলি না। বাড়ি বিক্রি করে হলেও তাকে বাঁচানোর আকুতি জানান স্বজনদের। বুধবার (১৫ জানুয়ারি ) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মৃত নাজমা বেগমের দুই সন্তান আহাজারি করছে। পাশেই বিলাপ করছেন স্বজনরা। তাদের শান্তনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে প্রতিবেশীরা। অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না। নাজমা বেগমের বোন মাকসুদা বেগম জানান, বোন জামাই মারা যাওয়ার পর সন্তাদের ভবিষ্যতের চিন্তা করে নাজমা আদম দালাল সিদ্দিকুর রহমানের প্ররোচণায় সৌদি আরব যান। হাসপাতালের ক্লিনার হিসেবে চাকরি দেওয়ার কথা বললেও তাকে দেওয়া হয় গৃহকর্মীর কাজ। কফিল (গৃহকর্তা) ও তার ছেলে নাজমাকে যৌন নির্যাতন করত। কথা না শুনলে মারধর করা হতো। তাকে ঠিকমতো খেতেও দিত না। এসব কথা আমাদের জানিয়ে নাজমা প্রায়ই ফোন করে কান্নাকাটি করতো ও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আকুতি জানাতো। গৃহকর্তার অমানুষিক নির্যাতনে নাজমার মৃত্যু হয়েছে। তিনি তার বোনের মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটন, কফিল (গৃহকর্তা) ও তার ছেলের বিচার, ক্ষতিপূরণসহ তার লাশ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। ছেলে রাজিব মিয়া জানান, নির্যাতনের খবর শুনে মাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আদম দালাল সিদ্দিকুর রহমানকে অনেকবার অনুরোধ করেছি। কিন্তু তিনি বিষয়টি কর্ণপাত করেনি। গত ২ সেপ্টেম্বর ভোরে এক সৌদি প্রবাসী ফোন করে মায়ের মৃত্যুর খবর দেন। মায়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনবো কীভাবে কিছুই বুঝতে পারছি না। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে বিধবা নাজমা বেগমকে সৌদি আরবে পাচার ও সেখানে নির্যাতনে তার নির্মম মৃত্যুর ঘটনা খুবই দুঃখজনক। পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির দাবি জানান তারা। এদিকে অভিযুক্ত আদম ব্যবসায়ী সিদ্দিকুর রহমানের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে ফোন করলেও তিনি ধরেননি। স্ত্রী হালিমা বেগম জানান, তার স্বামী এলাকার অনেক নারীকে বিদেশে পাঠিয়েছেন। কারো সমস্যা হয়নি। এব্যাপারে সিঙ্গাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাহেলা রহমত উল্লাহ বলেন, বিষয়টি জানার পর আমি জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসারের সঙ্গে কথা বলেছি। নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া স্বজনরা যেন মৃত্যুজনিত আর্থিক অনুদান ও ক্ষতিপুরণ পায় সে ব্যাপারেও খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে।
