সিরাজদিখান (মুন্সিগঞ্জ )প্রতিনিধিঃ মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার দিবাগত রাতে ওই মা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের কুসুমপুর জেনারেল হাসপাতাল নামে একটি বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে। নিহত প্রসুতির নাম জান্নাতুল ফেরদৌস জেনি (৩০)। তিনি ইছাপুরা ইউনিয়নের লোহারপুকুর পাড় এলাকার সিঙ্গাপুর প্রবাসী মো.নাঈম মোল্লার স্ত্রী। শনিবার তার মৃতদেহ ঢাকা থেকে বাড়িতে আনা হয়। নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা জানান,আগামী মাসের শেষ দিকে জান্নাতুল ফেরদৌস জেনির বাচ্চা প্রসবের সময় ছিল। জেনি গর্ভাবস্থায় নিয়মিত কুসুমপুর জেনারেল হাসপাতালে চেকআপ ও চিকিৎসা নিতে আসতেন।
শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় আলট্রাস্নোগ্রাফি এবং চেকআপ করাতে হাসপাতালে আসেন। তখন হাসপাতালের চিকিৎসক শিরীন আক্তার এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাচ্চার সমস্যা আছে সময়ের আগেই সিজারিয়ান অপারেশন করতে হবে। স্বজনরা তাদের কথায় জেনির সিজারের পারমিশন দেন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে জেনির সিজারিয়ান শুরু করে চিকিৎসক শিরীন আক্তার। দুই ঘণ্টার বেশি সময় পর্যন্ত সিজারিয়ান অপারেশন করেন।
একপর্যায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় জান্নাতের প্রচুর রক্তপাত হচ্ছে। ঢাকা থেকে চিকিৎসক আনতে হবে। তাঁরা ঢাকা থেকে ও চিকিৎসক এনে জান্নাতুল ফেরদৌস জেনির রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা করেন। তাতে ব্যর্থ হয় চিকিৎসক,রাতে জান্নাতুল ফেরদৌস জেনিকে রাজধানী ডেল্টা হাসপাতাল রেফার করেন। ডেল্টা হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার চিকিৎসকরা জান্নাতুল ফেরদৌস জেনির অবস্থা গুরুতর দেখে তারা চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।পরে সেখান থেকে অন্য একটি প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসা শুরু করা হয়। শুক্রবার রাত তিনটার দিকে জান্নাতুল ফেরদৌস জেনি চিকিৎসাধী অবস্থায় মারা যান।
জানা যায়,এর আগে ২০২১ সালে এ হাসপাতালে ভূল চিকিৎসায় বৃষ্টি নামে ১৭ বছরের এক তরুণী এবং চলতি বছরের মাস তিন আগে এক নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
জান্নাতুল ফেরদৌস জেনির ভাগ্নি লামিয়া আক্তার বলেন, আমার খালামণি ১৫ আগস্ট তারিখে ডেলিভারি করার ডেট ছিল, শুক্রবার বিকেলে আমার খালামনির আলট্রাস্নোগ্রাফি এবং রেগুলার চেকআপের ডেট ছিল,তাই সে কুসুমপুর জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডিজিটাল ডায়গনোষ্টিক সেন্টার আলট্রাসনোগ্রাম করতে যায়, কিন্তু চেকআপের সময় তাকে ডা. শিরীন আক্তার বলে এখনই সিজার করতে হবে। যদি আপনি এখন সিজার না করেন তাহলে আপনার বা আপনার বাচ্চার ক্ষতি হবে এমন ভয়ভীতি দেখায়। তাৎক্ষণিক ডা. না আসায় একটু দেরি করা হয়। কিছুক্ষণ পর বাচ্চা হওয়ার পর চিৎকার দিয়েছে আমরা শুনছি, তখন বাবুকে আমাদের কাছে দিয়ে অন্য ডাক্তার দেখানোর জন্য বলে,তখন আমরা সাথে সাথে অন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। দুই ঘন্টা হওয়ার পরেও খালামণিকে বেডে দেয় না। তখন আমরা বলি যে রোগীর যদি কোন সমস্যা থাকে তাহলে
অন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। আমাদের বলে রোগী সুস্থ আছে, এখনি বেডে দিচ্ছি এমন কথা বলে। অনেকক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের পর তারা বলে রোগীর একটি নাড় কেটে গেছে এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে,দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করতে বলছে।
আমরা দ্রুত রক্তের ব্যবস্থাও করছি।কিন্তু কোন লাভ হয়নি। ৪ ঘন্টা চেষ্টার পর তারা ঢাকা রেফার করে। তারা যে হাসপাতালে রেফার করে সেটা থেকে আবার আনোয়ার খান হসপিটাল এ নিয়ে যাই। সেখানে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।দেবর ইব্রাহিম বলেন, কুসুমপুর জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডিজিটাল ডায়গনোষ্টিক সেন্টারের ডা. শিরীন আক্তার আমার ভাবীর একটি নাড় কেটে ফেলে। তাদের ভুল চিকিৎসায় আমার ভাবীর অকালে প্রাণ দিতে হলো।আমরা চাই এই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে হাসপাতালটি একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া হক। এতে করে আর কারো অকালে প্রাণ জাতে না ঝরে।
এ বিষয়ে জানতে হাসপাতালটির পরিচালক রায়হান মল্লিকের ফোনে ফোন করা হলে তিনি হাসপাতালটির কেউ না দাবি করেন।প্রশ্ন উত্তরে এক পর্যায়ে তার পদের ব্যপারটি স্বীকার করেন।তবে ভূল চিকিৎসার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
রায়হান মল্লিক বলেন,চিকিৎসা ঠিক ছিল,অবস্থা খারাপ হওয়ায় ঢাকায় পাঠানো হয়, সেখানে আইসিইউতে মারা গেছে।বিষয়টি তারা স্থানীয় একজন প্রতিনিধির মাধ্যমে মিমাংসা করেছেন। এ নিয়ে কারো কোন অভিযোগ নেই।
নুসরাত নামে আরেক ভুক্তভোগী নারী বলেন, প্রায় তিন মাস আগে কুসুমপুর জেনারেল হাসপাতালে ডাক্তার শিরিন আক্তার আমার সিজার করেন। তখন আমার নবজাতক শিশুর মুখে ও মাথায় আঘাত পায়। তখন তাদের এই বিষয় জিজ্ঞাসা করা হলে তারা বলে জন্মগত দাগ এবং আমার বাচ্চাটি জন্মগত জন্ডিস ও ঠান্ডার সমস্যা ছিল। এ অবস্থায় তারা ৪ দিন কুসুমপুর জেনারেল হাসপাতালে রাখে। পরে খোঁজ নিয়ে জানি হাসপাতালটিতে শিশু বিশেষজ্ঞ কোন ডাক্তার ছিল না। তারা বলেন এভাবেই ভালো হয়ে যাবে। চার দিন পর আমাদের শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে
বলে। তখন আমরা শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসলে তিনি ঢাকা শ্যামলী শিশু হাসপাতালে রেফার করেন। সেখানে নিয়ে গেলে কয়েক ঘণ্টা পর আমার নবজাতক মেয়ে মারা যান। আমি তাদের বিচার চাই।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা.আঞ্জুমান আরা বলেন, কুসুমপুর জেনারেল হাসপাতালে একটি প্রসতি মার মৃত্যু হয়েছে এরকম খবর আপনাদের থেকে এবং অন্যান্য মাধ্যম থেকেও আমরা শুনেছি, আমরা অফিসিয়াল তদন্ত করবো, এরপরে আপনাদেরকে জানাতে পারবো কী কারণে মৃত্যু হয়েছে। তবে আপনাদেরকে আশ্বস্ত করে বলতে চাই, যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা ডক্টরের কোনো সমস্যা থাকে আমরা অবশ্যই প্রশাসনিকভাবে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তবে সেই ব্যবস্থা গ্রহণের আগে অবশ্যই আমাদের তদন্ত করে বের করতে হবে কি হয়েছিল।
এ বিষয়ে সিরাজদিখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো.মুজাহিদুল ইসলাম বলেন,শনিবার সকালে বিষয়টি শুনতে পেয়ে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে নিহতের পরিবারের কেউ বিষয়টি নিয়ে লিখিত অভিযোগ করেননি।তাই আমরাও কোন ব্যবস্থা নিতে পারিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাব্বির আহমেদ বলেন,উপজেলা যে সব প্রাইভেট হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ম বহিরভূত চলছে এবং সিজারিয়ান অপারেশন করছেন তাদের বিরুদ্ধে আগেও আমরা ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। নতুন করে আবারো অভিযান চালানো হবে।সেই সঙ্গে প্রসুতি মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
