ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল : আমরা প্রথম স্থান অর্জন করেছি। না এটি কোন ইতিবাচক প্রতিযোগিতায় নয়। নয় কোন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লড়াইয়ে। বায়ু দূষণে আমরা প্রথম স্থান অর্জন করেছি। দিল্লীকে হারিয়ে এখন আমরা প্রথম। কি ভয়াবহ! কি জঘন্য! কি আতঙ্কজনক!
তবুও আমাদের কর্তাব্যক্তিরা নিশ্চুপ। এখনো জরুরি অবস্থা ডাকা হয়নি পরিবেশ নিয়ে। একটি হুলস্থুল পড়ে যায়নি। কিছুদিন আগে একটা মিটিং হয়েছে কিন্তু সেখানে ৭জন মন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা আসতে পারেননি। এটিই আমাদের কঠিন বাস্তবতা। নিশ্চয়ই সব ইস্যুর মতই প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে আসতে হবে। বলতে হবে। তারপরও কিছু হবে কিনা জানিনা।
অফিসে আসতে আসতে আমি হিসেব করছিলাম। প্রায় ৫০টি বিল্ডিং ভাঙ্গা হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো সঠিকভাবে আবৃত করা হয়নি। চারিদিকে ধুলাবালি ছড়াচ্ছে। আদাবরে আমার বাসার সামনের বাস্তায় ইট, বালি সিমেন্ট ফেলে কাজ হচ্ছে প্রায় রাস্তা বন্ধ করে। এমন কাজ চলছে সারা ঢাকা শহর জুড়েই। এগুলো দেখার কেউ নেই। গতকাল বস্তি এলাকায় দেখলাম ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম চলছে। ফগার মেশিন থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে, সামনে এসে দেখলাম ময়লার স্তুপের থেকে ধোঁয়া উঠছে, গাড়ির ধোঁয়া, বাসায় কয়েল বা রাস্তায় কত কত ধোঁয়া আর কেমিকেল পোড়ানো হচ্ছে। এই ধোঁয়া আর ধুলাগুলো কোথায় গিয়ে জমা হচ্ছে। সেগুলো বায়ুতে কী কী যুক্ত করছে আর আমাদের শরীরে!
সারা বছরই ঢাকা শহরে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলে। তাই খোঁড়াখুঁড়ি একটি নিত্য-নৈর্মিত্তিক ব্যাপার। খোঁড়াখুঁড়ির মাটি ও অন্যান্য আবর্জনা দ্রুত অপসারণের জন্য পৃথক খাতে খরচ হয়। কিন্তু বিধি মোতাবেক কাজটি হয় না। এছাড়াও ড্রেনের ময়লা আবর্জনা রাস্তার দুপাশে দীর্ঘদিন ফেলে রাখা হয়। ফলে যানবাহন চলাচলের সময় ধুলা-বালি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার কারণে শীতে ধুলা-দূষণের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বায়ু দূষণে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, এলার্জি, চর্মরোগসহ নানা জটিল রোগব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ দূষণে জনদূর্ভোগের পাশাপাশি একদিকে যেমন স্বাস্থ্যগত সমস্যা হচ্ছে তেমনি আর্থিক ও পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে। পড়ছে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব।
শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা মহানগরীতে বায়ু দূষণের প্রকোপ অত্যন্ত বেড়ে যায়। এই মৌসুমেই হাজার হাজার ইটভাটায় ইট প্রস্তুত ও পোড়ানোর পাশাপাশি মহানগরীতে অপরিকল্পিতভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, ড্রেনেজ এবং রাস্তাঘাট উন্নয়ন, মেরামত ও সংস্কার কার্যক্রমের আওতায় রাস্তা-ঘাট খোঁড়া-খুঁড়ির পরিমাণ বেড়ে যায়। মেট্রোরেলসহ অন্যান্য মেগাপ্রকল্পের জন্য রাস্তা ও আশেপাশের বিশাল এলাকা জুড়ে খোঁড়াখুড়ি, গ্যাস-পানি, বিদ্যুতের লাইন স্থাপনের সময় রাস্তা খোঁড়াখুড়ি, মাটি, বালি, ইটসহ নির্মাণসামগ্রী আচ্ছাদনহীন ট্রাকে করে শহরে পরিবহন করা, ড্রেন পরিষ্কার করে রাস্তার পাশে স্তুপ করে রাখা, দোকান পাট ও গৃহস্থালীর আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলে রাখা, মেরামতহীন ভাংগাচোরা রাস্তায় যানবাহন চলাচল, পাকা ভবন নির্মাণের সময় মাটি, বালু, ইটসহ অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রী রাস্তা-ফুটপাতে ফেলে রাখা, পুরাতন ভবন ভাঙ্গা, মেশিনে ইট ভাঙ্গা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ধোঁয়া ইত্যাদি বায়ু দূষণের অন্যতম উৎস।
ঘরবাড়ি আসবাবপত্রসহ কাপড়-চোপড়ে ধুলা জমে যেভাবে প্রতিদিন নগর জীবনকে নোংরা করছে, তা পরিচ্ছন্ন রাখতেও নগরবাসীকে নষ্ট করতে হচ্ছে হাজার হাজার শ্রমঘণ্টা ও বিপুল পরিমাণ পানি এবং ডিটারজেন্ট। আর এসব ডিটারজেন্টের পরবর্তী গন্তব্য হচ্ছে নদী, লেক, জলাধারসমূহ। যা জলজ প্রাণীসহ সামগ্রিক জীববৈচিত্রের জন্যও ক্ষতিকর। কাপড়-চোপড় ইস্ত্রি করতেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়। অতিরিক্ত পানি, বিদ্যুৎ ও ডিটারজেন্ট ব্যবহারের ফলে পারিবারিকভাবে আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে ধুলা দূষণের কারণে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ৫,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। ধুলা দূষণের কারণে বৃক্ষের সালোকসংশ্লেষণে বাধার সৃষ্টি হয়। এছাড়াও ধুলা দূষণের ফলে মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ইমারত, কলকারখানা, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন স্থাপনায় মরিচা পড়ে সেগুলোর আয়ুষ্কাল কমিয়ে দিচ্ছে। এই সর্বগ্রাসী ধুলা দূষণে নগরবাসী অতিষ্ঠ, জনদূর্ভোগ চরমসীমায়।
নগরবাসীর স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে অচিরেই বায়ু দূষণের উৎসসমূহ বন্ধ করতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, ড্রেনেজ এবং রাস্তাঘাট উন্নয়ন, মেরামত ও সংস্কার কার্যক্রমের আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ রাস্তা-জায়গা খোঁড়াখুড়ি করে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন হওয়ামাত্র তা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং পর্যায়ক্রমে তা চালিয়ে যাওয়া, খোঁড়াখুড়ির সময় যাতে বায়ু দূষণ না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। ভবন নির্মাণ এবং ভাঙ্গার সময় যথাযথ নিয়ম মেনে তা করতে হবে এবং পাকা ভবন নির্মাণের সময় মাটি, বালু, ইটসহ অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রী রাস্তা-ফুটপাতে রাখা যাবেনা। ড্রেনের ময়লা এবং রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে ময়লা আবর্জনা জমিয়ে না রেখে সাথে সাথে অন্যত্র অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। গৃহস্থালী ও বাজারের ময়লা সঠিক নিয়মে দ্রুত সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ময়লা পরিবহনের গাড়িগুলোতে ভালোভাবে আচ্ছাদিত করে ময়লা পরিবহণ করতে হবে। বায়ু দূষণের সাথে জড়িত দায়ী ব্যাক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সর্বোপরি বায়ু দূষণের সকল উৎস বন্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জনদুর্ভোগ লাঘবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা এবং তা নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে।
উল্লেখ্য, পরিসেবা প্রদানকারী সংস্থাসমূহ কর্তৃক অবকাঠামো তৈরি, সম্প্রসারণ ও মেরামত করার সময় খননকৃত মাটি ও অন্যান্য সামগ্রী রাস্তায় ফেলে না রেখে দ্রুত অপসারণের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়ে থাকে। বরাদ্দকৃত অর্থ উত্তোলন করা হলেও এই অর্থের সঠিক ব্যবহার দৃষ্টিগোচর হয় না। দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে বায়ু দূষণের কারণে শিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত রোগ অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেড়ে যায়। শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে রোগীর প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি শ্বাসকষ্টজনিত বিভিন্ন রোগে ভর্তি হয়ে থাকে। অন্যদিকে ঢাকা মহানগরীর প্রায় ৯০ শতাংশ জনগণ ভয়াবহ বায়ু দূষণের শিকার হয়।
ঢাকা শহরের সমস্ত অঞ্চল জুড়ে বাতাসের মান পরিক্ষা করে জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে কিন্তু তার আগে প্রয়োজন প্রকৃত চিত্রগুলো বের করা। প্রয়োজন গবেষণা এবং ধারাবাহিক গবেষণা। কিন্তু আমরা সবচেয়ে কম খরচ করি গবেষণা খাতে। বায়ু দূষণের এ পরিস্থিতির কারণে মানুষ ভয়াবহ আতঙ্কিত। এ মেগাসিটি ঢাকা আজ পরিণত হয়েছে সবচেয়ে অস্বাস্থ্যকর নগরীর তালিকায়। আমরা যদি এ শহরকে বাসযোগ্য করতে চাই তবে এখনি সরকার ও নীতি-নির্ধারণী মহলকে সচেতনভাবে মৌলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। আর সেই সিদ্ধান্ত হতে হবে সমন্বিত সিদ্ধান্ত। সরকারের উন্নয়নকাজে যুক্ত সকল মহলকে নিয়ে এ পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়নের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মতই পরিবেশ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। কারণ একদিনে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়নি আর একদিনে তা সমাধান করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে নাগরিকদের ভূমিকাও নির্ধারণ করে দিতে হবে। নিশ্চয়ই আমরা দূষণ ও পরিবেশ বিপর্যয়ে এক নম্বর থাকতে চাই না!
