চলে গেলেন আব্দুল রউফ বেপারী

আমি ভাল আছি। কোন সমস্যা নেই। দুই ছেলেই আমাকে দেখাশোনা করে। রাজুলকে (পালিত ছেলে) আমার নিজের ইচ্ছাতেই বসত বাড়ির তিনভাগের এক ভাগসহ কিছু জমি লিখে দিয়েছি। বড় ছেলে তারাজুল হক জানে। মাসখানেক আগে স্থানীয় কয়েকজন সংবাদকর্মীর সাথে কথপোকথনের সময়ে ৯৬ বছর বয়সী আব্দুল রউফ বেপারী এভাবেই জানিয়েছিলেন। এসময় তিনি কানে কম শুনছিলেন, কথাগুলোও ছিল কিছুটা জড়ানো।

গত ১৬ মার্চ ভোররাত ৩টার দিকে মহান সৃষ্টিকর্তার ডাকে চলে গেছেন আব্দুল রউফ বেপারী। তিনি ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার নয়নশ্রী ইউনিয়নের দেওতলা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে, পুত্রবধূ, নাতি-নাতনী রেখে যান। এর আগে গত ২০২২ সালের ৩০মে তাঁর স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

জানা যায়, মরহুম আব্দুল রউফ বেপারীর দুই ছেলে। বড় ছেলে মো. তারাজুল হক (৬৫) তাঁর ঔরষজাত এবং ছোট ছেলে রাজুল হক (৪৮) তার আপন শ্যালিকার ছেলে দত্তকপ্রাপ্ত বলে জানা যায়।

সূত্র জানায়, মরহুম আব্দুল রউফ বেপারীর নামে ২২ পাকির অধিক জমি-জমাসহ গাজীপুরে সাড়ে ৩ শতাংশের একটি বাড়ি ছিল। পালিত ছেলের প্রাপ্য হিসেবে আব্দুল রউফ বেপারী গত ১৩/০৮/২০২৩ তারিখে ছোট ছেলে রাজুল হককে বসত বাড়িসহ কিছু জমি লিখে দিলে দুই ভাই সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে জড়ায়। বিগত ৭ মাস আগে সামাজিক মিমাংসায় বসে জানা যায়, রাজুল হক ছিলেন বাবার পালিত ছেলে। এসব দ্বন্দ্বে স্থানীয় একটি স্বার্থান্বেষী মহলের মদদে একে অপরের বিরুদ্ধে করেছেন একাধিক মামলা। ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পত্তি ভাগাভাগিতে সৃষ্টি করছেন অন্তর কোন্দল। বৃদ্ধ বাবাকেও করেছিলেন ওষ্ঠাগত।

তবে রাজুল হক জানিয়েছেন, আমার আর সম্পত্তি চাই না। তবুও দ্বন্দ্বের অবসান হোক। কিন্তু বাঁধ সেঁধেছেন বড় ভাই তারাজুল হক। তিনি বলছেন, ও (রাজুল) আমার ভাই নয়। বাবাকে জোড় করে সম্পত্তি লিখে নিয়েছে।

জানা যায়, মরহুম আব্দুল রউফ বেপারীর দেওতলা মৌজার বসত বাড়িসহ ২২ পাকি অধিক জমি-জমা ছাড়াও গাজীপুরে ছোট ছেলে ও তার নামে আধা-আধি ৭ শতাংশের একটি বাড়ি আছে। মৃত্যুর ৭ মাস আগে দত্তকপ্রাপ্ত ছেলে রাজুল হককে দেওতলার বসত বাড়ির সাড়ে ২৬ শতাংশ ও পুরাতন দালানসহ ৮৬ শতাংশ জমি নবাবগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ৬১১৬/২০২৩ নং দলিলমুলে রেজিষ্ট্রি করে দিয়ে যান। এতে বাঁধ সাধেন বড়ভাই তারাজুল হক। বৃদ্ধ বাবাকে জোর করে জমি রেজিষ্ট্রি করে নিয়েছেন মর্মে ছোট ভাই রাজুল হকের বিরুদ্ধে দলিল বাতিলের মামলা করেন। ছোট ভাই রাজুল হকের জাতীয় পরিচয়পত্রে বাবার নাম বাতিল চেয়ে করেছেন আরও একটি মামলা। এছাড়াও গাজীপুরের টঙ্গীতে থাকা রাজুল হক ও আব্দুল রউফ বেপারীর নামে থাকা ৭ শতাংশের বাড়ি বিক্রির বায়না ও রেজিষ্ট্রি সংক্রান্ত একটি জালিয়াতি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলেও জানা যায়।

এবিষয়ে জানতে গত প্রায় একমাস আগে দেওতলা গ্রামের বাড়িতে গেলে মো. তারাজুল হক জানান, ও আমার পালিত ভাই। ওকে আমি ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতাম। আমি দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলাম। সব টাকা ওর কাছে পাঠিয়েছি। ওকে বিয়ে করিয়েছি। পরিবারের খরচও হতো আমার টাকায়। আমায় সর্বশান্ত করেছে। বাবাকে জোর করে বাড়ি-ঘর লিখে নিয়েছে। তাই আমি মামলা করেছি।

রাজুল হক এবিষয়ে অভিযোগ করে জানান, মারা যাওয়ার একমাস আগেও বাবা আমার কাছেই ছিল। অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে বড়ভাই বাবাকে তুলে নিয়ে বাড়িতে এসেছিল। ওরা বাড়িতে রেখে চিকিৎসা না করিয়ে বাবাকে মেরে ফেলেছে।

রাজুল হক বলেন, দীর্ঘ বছর বড়ভাইয়ের সাথে বিদেশে ইলেকট্রিকের কাজ করেছি। আমাকে একটি টাকাও হাতে দেয়নি। চাইলে বলেছে টাকা দিয়ে কি হবে, বাড়িতে গিয়ে নিস। বাড়িতে এসে বলে আমি নাকি তার সব টাকা খেয়ে ফেলেছি। মিথ্যা অভিযোগ।

তিনি আরও বলেন, বাবা আমার পরিবারের সেবা যন্তে সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে ৮৬ শতাংশ জমি রেজিষ্ট্রি করে দিয়েছেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বড় ভাই তারাজুল হক মামলা দিয়ে আমার পরিবার বাড়ি ছাড়া করেছে। আমার টয়লেট, নলকুপ ভেঙে দিয়েছে। সামাজিকভাবে হেয় করতে নানাভাবে চাপ দিয়ে আসছেন। গাজীপুরের টঙ্গীতে বাবা ও আমার নামে থাকা (আধা-আধা) শতাংশের একটি বাড়ি জালিয়াতি করে বায়না নামা করে বিক্রির ষড়যন্ত্র করেছে। তাতে আমার ও বাবার টিপসহি, স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। আমি বাড়ি-ঘর ছেড়ে বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, দুই ছেলের বিবাদ মিমাংসা দেখে যেতে পারলেন না বাবা আব্দুল রউফ বেপারী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *