ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট: সুন্দরবনের জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্ট গার্ডের হারবাড়িয়া স্টেশনে দুর্বৃত্তদের ভয়াবহ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, যা বনদস্যু দমনে বাহিনীর চলমান সফলতাকে বাধাগ্রস্ত করার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে ধারণা করা
সুন্দরবনের জয়মনির ঘোল এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের হারবাড়িয়া স্টেশনে গত বৃহস্পতিবার একদল দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বনদস্যু দমনে নিয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সংঘটিত এই হামলায় দায়িত্বরত বেশ কয়েকজন কোস্ট গার্ড সদস্য আহত হয়েছেন। ঘটনার পরপরই কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর এই ধরনের হামলা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর মনোবল ভাঙার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। বর্তমানে কোস্ট গার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় ব্যাপক যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ঘটনার পর থেকে পুরো সুন্দরবন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং সন্দেহভাজনদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে মোংলা থানাধীন জয়মনির ঘোল এলাকাটি বনদস্যু ও তাদের সহযোগীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জানমালের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ ছিল। কোস্ট গার্ডের হারবাড়িয়া স্টেশন স্থাপনের পর থেকে দস্যুদের অস্ত্র সরবরাহ, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং রসদ সংগ্রহের পথ অনেকাংশে রুদ্ধ হয়ে পড়ে, যার ফলে তারা কোস্ট গার্ডের উপস্থিতিকে তাদের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। ভুক্তভোগী কোস্ট গার্ড সদস্যদের ভাষ্যমতে, হামলাকারীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে স্টেশনের অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায় যাতে বাহিনীর টহল কার্যক্রম ব্যাহত হয়। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বনদস্যু ও অসাধু চক্রগুলো তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পুনরায় নির্বিঘ্নে পরিচালনার লক্ষ্যে কোস্ট গার্ডকে এলাকা থেকে বিতাড়িত করার পায়তারা করছে। কোস্ট গার্ডের দাবি, বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়া অপরাধী চক্রটিই এই হামলার মূল হোতা, যারা সুন্দরবনের বনজ সম্পদ লুটপাটে বাধা প্রদানকারী প্রতিটি শক্তির ওপরই ক্ষুব্ধ।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া উইং জানিয়েছে যে, কোনো ধরনের অপপ্রচার, হামলা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তাদের আইনি অভিযানকে স্তব্ধ করা সম্ভব নয়। কোস্ট গার্ডের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, এই হামলার পেছনে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ও অসাধু চক্রের ইন্ধন রয়েছে, যারা সুন্দরবনকেন্দ্রিক অবৈধ ব্যবসায় লিপ্ত। স্থানীয় জনগণ ও গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি বাহিনীর আহ্বান, কোনো ধরনের বিভ্রান্তিমূলক তথ্যে কান না দিয়ে প্রকৃত সত্য যাচাই করে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, হারবাড়িয়া স্টেশনে হামলার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হবে এবং স্টেশনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে এবং সুন্দরবনের নিরাপত্তা বলয় অটুট রাখতে কোস্ট গার্ড তাদের নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের পরিধি আরও বিস্তৃত করার ঘোষণা দিয়েছে।
সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর এই ধরনের হামলা পুরো উপকূলীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। অপরাধীরা যদি এভাবে সরাসরি সরকারি স্থাপনায় হামলা চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে ভবিষ্যতে বনদস্যু দমনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ মানুষ ও পরিবেশবাদী সংগঠনের দাবি, কেবল হামলাকারীদের গ্রেপ্তার নয় বরং সুন্দরবনকে অপরাধমুক্ত রাখতে কোস্ট গার্ডের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে এবং স্থানীয় অসাধু চক্রের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি নির্মূল করতে হবে। এই ঘটনার প্রভাব যেন বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী বনদস্যু দমন অভিযানে না পড়ে, তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সুন্দরবনের স্থিতিশীলতা রক্ষায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
