বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনা

আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন একুশে ফেব্রুয়ারি। এটি বাংলাদেশের শহিদ দিবস একই সাথে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। একুশে ফেব্রুয়ারি এই পর্যায়ে আসার পেছনে রয়েছে নিদারুণ ইতিহাস।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে যায়। ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় দুটি আলাদা রাষ্ট্রের। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পশ্চিমাঞ্চলের শাসকগোষ্ঠী পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিকে তাদের অধীন করে রাখার পরিকল্পনা করে। এর অংশ হিসেবে প্রথমেই তারা বাঙালিদের ভুলিয়ে দিতে চায় তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রভাষা। এ প্রকৃত সত্য অস্বীকার করে বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পায় তারা। উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভাষা কেড়ে নিয়ে বাঙালির জাতিসত্তাকে পঙ্গু করে দেয়া। কিন্তু এই হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে বাঙালিরা। শুরু হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।

রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথাবার্তা শুরু হবার সাথে সাথেই পূর্ব বঙ্গের ছাত্র, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ, বুদ্ধিজীবী আর রাজনীতিবিদরা বুঝেছিলেন যে এটা বাঙালিদের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। তারা বুঝলেন, এর ফলে পাকিস্তানে উর্দুভাষীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হবে। বাঙালিরা সরকার ও সামরিক বাহিনীতে চাকরি-বাকরির সুযোগের ক্ষেত্রে উর্দু-জানা জনগোষ্ঠীর তুলনায় পিছিয়ে পড়বেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার ফলে বাঙালি মুসলমানদের উন্নয়ন ও সামাজিক বিকাশের স্বপ্ন সৃষ্টি হয়েছিল – তা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

অথচ পাকিস্তানের হাকিকত ছিল, সেদেশের পূর্বাংশে এবং গোটা দেশ মিলিয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাই ছিল বাংলা। পশ্চিম পাকিস্তানে ৪০ শতাংশের কিছু বেশি লোকের ভাষা ছিল পাঞ্জাবী, আর মাত্র চার শতাংশের ভাষা ছিল উর্দু। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা হয়েও বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে না এটা পূর্ববঙ্গের ছাত্র ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশ্লেষক রওনক জাহান বলেন, “একদিকে ভাষা ও আত্মপরিচয়ের আবেগ তো আছেই – তা ছাড়াও এর একটা অর্থনৈতিক দিক আছে”। তার কথায়, “তখন চাকরির সুযোগ বলতে সরকারি চাকরিই ছিল। কিন্তু উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে সরকারি চাকরি বা সেনাবাহিনীতে চাকরি পেতে বাঙালিদের উর্দু শিখতে হবে, উর্দুভাষীদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে – ফলে তাদের ডিসএ্যাডভান্টেজ হয়ে যায়। ফলে ছাত্রদের জন্য এটা ছিল ভবিষ্যতের প্রশ্ন।”

তমদ্দুন মজলিস এই সময় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিল। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরে অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন, দৈনিক ইত্তেহাদের সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ, আর তমদ্দুন মজলিস প্রধান অধ্যাপক আবুল কাসেমের নিবন্ধ ছিল।

আবুল মনসুর আহমদ লিখেছিলেন, “উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করিলে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ রাতারাতি ‘অশিক্ষিত’ ও সরকারি চাকুরির ‘অযোগ্য’ বনিয়া যাইবেন” – ঠিক যা ঘটেছিল ব্রিটিশরা ফার্সীর জায়গায় ইংরেজিকে ভারতের রাষ্ট্রীয় ভাষা করার পর ভারতের মুসলিম শিক্ষিত সমাজের ক্ষেত্রে।”

“ভাষার প্রশ্নটি যে পাকিস্তানের এক অংশের ওপর আরেক অংশের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আধিপত্য বিস্তারের সাথে জড়িত এই বোধ তখন সবার মধ্যে জন্মাতে শুরু করেছে” – বলেছিলেন আবুল মনসুর আহমদ ।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি

নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা কী হবে – তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল ভারত ভাগের আগেই। অবাঙালি মুসলিম রাজনীতিবিদ ও অধ্যাপক-বুদ্ধিজীবীরা বলছিলেন উর্দু ভাষার কথা। অন্যদিকে ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ ও এনামুল হকের মত বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়ার পক্ষে ছিলেন না।

লেখক বদরুদ্দীন উমর ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ নামক বইতে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, সেসময় কীভাবে ছোট বড় অনেক রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন ছাত্র ও নাগরিক সংগঠন, আর শিক্ষক-অধ্যাপক-চিন্তাবিদরা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে কথা বলতে শুরু করেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ও অধ্যাপক মিলে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তমদ্দুন মজলিস নামে একটি সংগঠন সৃষ্টি করেন, যারা শুরু থেকেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে নানারকম সভা-সমিতি ও আলোচনার আয়োজন করে। গঠিত হয়েছিল ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। পরিষদের নেতারা ১৯৪৮ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের সাথে একটি বৈঠক করেন। সেখানে তারা ডাকটিকিট-মুদ্রা ইত্যাদিতে বাংলা না থাকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ফজলুর রহমান তাদের আশ্বাস দেন যে এগুলো ঘটেছে ‘নিতান্ত ভুলবশত:।

ঢাকায় ১৯৪৭ সালেরর ৫ই ডিসেম্বর বর্ধমান হাউসে (বর্তমান বাংলা একাডেমি ভবন) বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লিগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে প্রস্তাব নেয়া হয় যে উর্দুকে পূর্ব বাংলার সরকারি ভাষা করা হবে না। এ বৈঠকের সময় বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকরা। ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ৬-৭ মাস পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ঢাকায় আসেন, তখনই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ রীতিমত উদ্বিগ্ন এবং ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন।

‘একমাত্র’ না ‘অন্যতম’ রাষ্ট্রভাষা

মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ সহ যারা উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলছিলেন তাদের অধিকাংশেরই কথা ছিল – উর্দু হবে পাকিস্তানের ‘একমাত্র’ রাষ্ট্রভাষা।

আর যারা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি করছিলেন, এদের মধ্যে নানা ধরণের মত ছিল। কেউ বলছিলেন, পাকিস্তানের প্রধান রাষ্ট্রভাষাই হতে হবে বাংলা, কারণ গোটা পাকিস্তানে বাঙালিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কেউ কেউ বলছিলেন, বাংলা ও উর্দু দুটিই হবে রাষ্ট্রভাষা। কেউ বলছিলেন, বাংলা হবে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি কাজের ভাষা, তবে দুই অংশের মধ্যে যোগাযোগের বাহন হিসেবে উর্দূ ও আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষাও থাকবে।

কিন্তু তাদের সবার অভিন্ন অবস্থান ছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের প্রধান ভাষা হতে হবে বাংলা।

গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি

পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের অধিবেশন বসেছিল ১৯৪৮ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি। এই গণপরিষদের কার্যক্রমে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষাও যেন ব্যবহৃত হতে পারে – এমন এক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তার যুক্তি ছিল, পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লক্ষ লোকের মধ্যে ৪ কোটিরও বেশি লোকের ভাষা বাংলা অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাই বাংলা। তাই বাংলাকে পাকিস্তানের একটি প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে দেখা উচিত নয়, বাংলারও হওয়া উচিত অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু মি. দত্তের এ সংশোধনীর প্রস্তাব গণপরিষদে টেকেনি। এমনকি গণপরিষদের বাঙালি সদস্যরাও সংসদীয় দলের আপত্তির কারণে তাকে সমর্থন করতে পারেননি।

এর প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্ররা ক্লাস বর্জন ও ধর্মঘট করে। ১১ই মার্চ ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলায় পালিত হয় ‘ভাষা দিবস’।

লেখক বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন, ঢাকায় ১১ মার্চ বিভিন্ন সরকারি ভবনের সামনে বাংলা ভাষার জন্য বিক্ষোভ হয়, দুজন মন্ত্রীকে পদত্যাগপত্র স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন বিক্ষোভকারীরা। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনকে গণপরিষদ ভবন থেকে বের করে নিতে সেনাবাহিনী ডাকতে হয়েছিল।

পুলিশ যে আন্দোলনকারী নেতাদের গ্রেফতার করে তাদের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, অলি আহাদের মতো অনেকে, আর শেখ মুজিবুর রহমান। এই নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৩-১৫ই মার্চ ঢাকায় ধর্মঘটও পালিত হয়েছিল।

দুদিন পর খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ছাত্রদের এক বৈঠক হয়, এতে চুক্তি হয় যে তার সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য পাকিস্তানের গণপরিষদকে অনুরোধ করবে।

একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২

উপরোক্ত প্রতিবাদ-বিক্ষোভ, চুক্তি, স্মারকলিপি, পার্লামেন্টে বিতর্ক – এসবে আপাতদৃষ্টিতে তেমন কোন কাজ হযনি। মি. জিন্নাহ’র মৃত্যুর পরও রাষ্ট্রভাষা নিয়ে কয়েক বছর ধরে নানা রকম প্রস্তাব-পাল্টা প্রস্তাব, সংবাদপত্র-সভাসমিতিতে বিতর্ক চলতে থাকে। ।

১৯৫২ সালের শুরু পর্যন্ত বাঙালি রাজনীতিবিদদের বড় অংশই জোরালো ভাবে রাষ্ট্রভাষা উর্দুর বিরুদ্ধে মনোভাব ব্যক্ত করতে থাকেন। থেমে থেমে আন্দোলন চলছিল ।

খাজা নাজিমুদ্দিন এর মধ্যে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তিনি ১৯৫২ সালের ২৭ শে জানুয়ারি এক বক্তৃতা দিলেন – যাতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন আবার নতুন করে জ্বলে ওঠে।

পূর্ব-বঙ্গের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও খাজা নাজিমুদ্দিন সেই বক্তৃতায় বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, এবং দুটি রাষ্ট্রভাষা নিয়ে কোন রাষ্ট্র সমৃদ্ধির পথে এগুতে পারে না’। তিনি আরো বলেন, পূর্ব বঙ্গের ২৭টি শিক্ষাকেন্দ্রে এর মধ্যেই আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে।

এর ফলে নতুন করে শুরু হয় ছাত্র বিক্ষোভ, ধর্মঘট, হরতাল। গঠিত হয় সর্বদলীয় একটি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে স্থানীয় প্রশাসন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতারা ঠিক করেন, তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন।

আজকের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ সেসময় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন। সেখানে ২১শে ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভকারীরা ১৪৪ ধারা ভাঙতে গেলে পুলিশ ছাত্রদের গ্রেফতার করে, পরে কাঁদানে গ্যাসও নিক্ষেপ করে। দুপুরের পর বিক্ষোভরত ছাত্রদের একটি দল গণপরিষদ ভবনের দিকে যাবার চেষ্টা করলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে।

পর দিন ২২শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার কয়েকটি জায়গায় আবার পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। সরকারি হিসেবে চারজন নিহত হবার কথা বলা হয়। কিন্তু দু’দিনে ঠিক কতজন আসলে নিহত হয়েছিলেন তার সঠিক সংখ্যা এখনো অজানা।

ভাষা আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে শহিদ মিনার নির্মাণ, তা ভেঙে ফেলা ও পরে পুনঃনির্মাণ, একুশে নিয়ে গান ও কবিতা রচনা, – এগুলোর মাধ্যমে কয়েক বছরের মধ্যেই বাঙালির এক প্রতীকী সাংস্কৃতিক ঘটনায় পরিণত হয় একুশে ফেব্রুয়ারি।

আফসান চৌধুরী বলছিলেন, “শহিদ মিনার বানানোর বিষয়টা হলো – এই যে প্রতীক তৈরি হওয়া, ইতিহাসের মধ্যে এরকম প্রতীকায়ন থাকতে হয়, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা আন্দোলন এটা করেছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভেতর থেকে ‘আমি পাকিস্তানি’ এই বোধটা দূর্বল করেছে ভাষা আন্দোলন । শিক্ষিত সকল গোষ্ঠীর চোখ খুলে দিয়েছে, তাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।”

শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু এবং বাংলা – এই দুই ভাষাকে স্থান দেয়া হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনা

ভাষা-বিতর্কে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষেই এ সচেতনতা তৈরি হয়েছিল যে এ সমস্যার যথাযথ নিষ্পত্তি না হলে তা এক সময় পাকিন্তানের ঐক্য বিপন্ন করতে পারে। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হবার পরপরই এ সংঘাত শুরু হয়ে গিয়েছিল।

রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে সংঘাত থেকেই কি তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশের ভাবনার জন্ম হয়েছিল?

অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন,
“ভাষা-সংস্কৃতি ভিত্তিক একটা জাতীয়তার বোধ বাঙালিদের মধ্যে ছিল, তবে কেন্দ্রীয় সরকারে গিয়ে পাকিস্তান শাসন করার আগ্রহ খুব একটা ছিল না। প্রথম থেকেই কথাটা ছিল স্বায়ত্বশাসন। আপনি যদি ১৯৫৪ সালের ২১ দফা দেখেন – সেখানেও ভাষার সাথে আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের একটা জোরালো যোগাযোগ ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ধর্মের কথা থাকলেও তার মূল বার্তাটা ছিল যে মুসলিমদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হলে তাদের পশ্চাৎপদতা কাটবে, হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের আধিপত্য থেকে তারা মুক্তি পারে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ খুলে যাবে। বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে পাকিস্তানের দাবি এ কারণেই জনপ্রিয় হয়েছিল।
কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও সে আকাঙ্ক্ষা পূরণের সম্ভাবনা দেখা গেল না। আর রাষ্ট্রভাষার দাবিও যখন মানা হচ্ছিল না তখন খুব সহজেই বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভ এবং ক্রোধ সৃষ্টি হয়।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের গবেষক ও ইতিহাসবিদ আফসান চৌধুরী মনে করেন, ” যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশি দেখেন – তারা ভাষা আন্দোলন থেকেই এর শুরু এরকম মনে করেন।” তিনি আরো বলেন, “কিন্তু ইতিহাসটা একটা ধারাবাহিকতার বিষয়। পূর্ববঙ্গের মানুষের স্বাথীনতা বা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের আকাঙ্ক্ষা অনেক আগেই সৃষ্টি হয়েছিল। এই ধারাবাহিকতার একটা অংশ হচ্ছে ৫২’র ভাষা আন্দোলন। তবে মধ্যবিত্ত ছাড়া তো আন্দোলন হয়না – আর ভাষা আন্দোলন সেই মধ্যবিত্তকে সংহত করেছে।

বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে যোগ করে নতুন মাত্রা। শহীদদের রক্ত তাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে প্রেরণা জোগায়। এর পরের ইতিহাস পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের। ’৫৪-র নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই, ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়লাভ এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা লাভ করে বাঙালির স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বাঙালি মুক্ত হয় ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাই একুশ আমাদের জাতীয় জীবনে এক অন্তহীন প্রেরণার উৎস।

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এর অর্থ পৃথিবীর সব মাতৃভাষাই স্ব স্ব জাতির নিজস্ব ও অপরিবর্তনযোগ্য ভাষা। সব মাতৃ ও আঞ্চলিক ভাষাকেই সমান মর্যাদা দিয়ে সংরক্ষণের দায়িত্ব রয়েছে বিশ্ববাসীর। একুশের শহীদদের প্রতি জানাই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা। শহীদ স্মৃতি অমর হোক।

লেখক : তাজওয়ার মুনির

সাধারণ সম্পাদক, শান্তির অভিযাত্রী ছাত্র ও সমাজকল্যাণ সংগঠন, শিক্ষার্থী, কবি নজরুল সরকারি কলেজ (ইংরেজি সাহিত্য)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *