নবাবগঞ্জে গৃহবধূকে মেসেজ দেওয়াকে কেন্দ্র করে তরুণকে মধ্যযুগীয় কায়দায় মারধর

ঢাকার নবাবগঞ্জে এক গৃহবধূকে মেসেজ দেওয়াকে কেন্দ্র করে এক তরুণকে কয়েকঘন্টা আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় মারধর, হত্যার হুমকি এবং জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কয়েকজনের বিরুদ্ধে। নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বকসনগর ইউনিয়নের টুকনীকান্দা এলাকায়।

ভুক্তভোগী ২৪ বছর বয়সী তরুণ মোহাম্মদ হৃদয় একই ইউনিয়নের বালুরচর গ্রামের শাহ আলমের ছেলে। তাঁর অভিযোগ, ভুলবশত তিনটি মেসেজ ও অনিচ্ছাকৃত একটি ফোনকলকে কেন্দ্র করে তাঁকে আটকে রেখে মারধর করা হয়।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত পক্ষের দাবি, ওই তরুণ গৃহবধূকে অশ্লীল মেসেজ ও কল করে বিরক্ত করছিলেন। গৃহবধূর স্বামী ও তাঁর পরিবারের পক্ষের লোকজনের ভাষ্য, হৃদয়ের বিরুদ্ধে এলাকায় আগেও একাধিক বিচার-সালিশ হয়েছে। ও একটা খারাপ চরিত্রের ছেলে।

ভুক্তভোগী হৃদয়ের দাবি, গত ৫ অক্টোবর তিনি ওই গৃহবধূর ফেসবুক মেসেঞ্জারে প্রথমে ‘হাই’, পরে ‘কেমন আছেন’ এবং ‘ঘুমিয়েছেন কি না’—এমন তিনটি বার্তা পাঠান। এ সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে একটি কল চলে গেলে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই তা কেটে দেন বলে দাবি করেন। পরে গৃহবধূর উত্তর পেয়ে কথোপকথন শেষ করেন তিনি।

হৃদয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দুই দিন পর ৮ অক্টোবর সকালে যাত্রী নিয়ে অটোরিকশায় যাওয়ার সময় শুরগঞ্জ মসজিদের সামনে সায়েদ নামের এক ব্যক্তি তাঁর পথ আটকে মোবাইল ফোনের লক খুলতে বলেন। এরপর মেসেঞ্জারের কথোপকথন দেখে তাঁকে মারধর করা হয় এবং মোটরসাইকেলে করে টুকনীকান্দা এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ তাঁর। সেখানে কয়েকজন মিলে তাঁকে কয়েকঘন্টা আটকে রেখে লাঠিসোঁটা দিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেন হৃদয়। এ সময় হত্যার হুমকি এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও ধারণ করা হয় দাবি তার।

হৃদয়ের বাবা শাহ আলম জানান, তাঁকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ছেলের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। ছেলেকে বুঝে পাওয়ার পর তিনি হাসপাতালে নিয়ে যান বলে দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, ছেলের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল; কিন্তু এভাবে নির্যাতন করার অধিকার কারও নেই। এভাবে মারধরের সুষ্ঠ তদন্ত ও বিচার দাবি করেন তিনি।

এখন প্রশ্ন—কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছেন বলে অভিযোগ উঠলেই কি তাঁকে নিজের হাতে শাস্তি দেওয়া যায়? চলুন জেনে আসা যাক বাংলাদেশের আইন কী বলছে?

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী, কাউকে বেআইনিভাবে আটকে রাখা, শারীরিক আঘাত করা, গুরুতর জখম করা কিংবা ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনায় পরিস্থিতি ও প্রমাণ অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আনা যেতে পারে। দণ্ডবিধির ৩৪২ ধারায় বেআইনিভাবে আটকে রাখার শাস্তি সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। ৩২৫ ধারায় স্বেচ্ছায় গুরুতর আঘাত করার অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। আর ৫০৬ ধারায় অপরাধমূলক ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্যও শাস্তির বিধান রয়েছে।

এ ছাড়া, কাউকে আটকে রেখে স্বীকারোক্তি আদায়ের উদ্দেশ্যে নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির ৩৪৮ ধারাসহ প্রাসঙ্গিক অন্যান্য ধারা বিবেচনায় আসতে পারে। তবে কোন ধারায় মামলা হবে এবং কী শাস্তি প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে তদন্ত, প্রমাণ ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে থানায় অভিযোগ করা, পুলিশের সহায়তা নেওয়া এবং আদালতের আশ্রয় নেওয়াই আইনসম্মত পথ।

এ বিষয়ে নবাবগঞ্জ থানার ওসি মো. আবু হানিফ জানান, এ ঘটনায় মারধরের শিকার তরুণ নিজেই বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় মামলা করেছেন। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *