আমি বাদলধারায় অগ্নিবর্ষণ তালাশ করি। আমি মৃত্যুর মোহনায় বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে উঠি জলকেলিতে, ভয়াল অগ্নির হল্কায় আমি হাজার ফুলের সৌরভ শুকি। সুতীব্র বজ্রপাতে দেখি প্রেয়সীর প্রেমময় দৃষ্টিপাত, আমি ভুলে থাকি আহত হওয়ার আঘাতে ফেরানো অভিঘাত। প্রজ্জ্বলিত লেলিহান শিখায় আমি ভালোবাসা বিলাই অকাতরে। স্বপ্নাতুর চোখগুলো আমার কাতর হয় তবু আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ের আর্তনাদ ক্লান্ত হয় না।
বুড়িয়ে যাওয়ার ভাটির স্রোতকে উল্টোরথে ফেরাতে চাই নি কখনও। মৃত্যুকে নয় জীবনকে তাতে উপলব্ধি করি স্বাভাবিকতায়। এখন যেমন সময় বইছে উল্টো স্রোতে, সে তেমনই বইছিল তখনও। অবিশ্বাসী চোখ, নিরাশ অন্তর জুড়ে স্বপ্নরা ধরা দেয় নি ভুল করেও। নিজেরে পাই নি নিজের মাঝে লক্ষ বছর খুঁজেও। তাই অস্তিত্বকে কোনো ছাঁচে অন্বেষণ করি নি কোনো ক্ষণেও। আমি যেমন তেমনই বয়ে যাই আমার মতন। শুদ্ধ রচনার খেদ ছিল না, মানুষের স্তুুতিবাক্য আমার কাছে কাঙ্খিত নয় কোনো কালে। আপন বিহাগে আমি বেসুরো সুর তুলি মোহময়তায়।
আমি ধ্বংসলীলায় সৃষ্টি এবং স্রষ্টার মাহাত্ম দেখেছি। প্রেমহীন মানবের অমানবিকতায় মনস্তত্ত্বে আমি মানবিক অনুভব উপলব্ধি করেছি। মনহীন মানুষের বিষম বিহারে নিরাশ মনে আশার বীজ বপন করতে অভ্যস্ত হয়েছি। উত্তাল স্রোতের উজানে বৈঠা চালাই হৃদয় দোলানো ছন্দে। আমি মুখাবয়ব অন্বেষণ করতে গিয়ে তার রঙচটা মুখোশকে জেনেছি বার বার। আমি স্বর্গের স্রষ্টাকে জেনেছি নির্বোধ মানবের মাঝে। জ্ঞান, বুদ্ধিতে ঠাসা মানুষের মধ্যে পেয়েছি ধূর্ত, স্বার্থপর, সচেতন শয়তান।
অদৃশ্য স্রষ্টা এবং অদৃশ্য শয়তান উভয়ই যথেষ্ট প্রভাবশালী। যদিও স্রষ্টার শক্তি অনেক বেশি তবে তার নিরঙ্কুশ অংশ চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য বকেয়া রাখা হয়। শয়তানের শক্তি কম হলেও অনর্থ প্রয়াস, মোহময়তার অবস্থানে যথেষ্ট। তাই স্রষ্টার প্রভাব মানুষের মনে প্রত্যক্ষভাবে যতটা কার্যকর তার চেয়ে ঢের কার্যকর শয়তানের প্রভাব। যে ভজনালয় স্রষ্টার আরাধনায় গড়ে তোলা হয় সেখানে শয়তান বুকে পুষে বসবাস করে উপাসনাকারী। তার কাছে স্রষ্টার আবাস মানুষের দুঃখ-কষ্টের চেয়ে ধর্মের পরগাছা হয়ে স্বল্প স্বার্থসিদ্ধির ধ্যান অনেক বড়। তাই ক্ষুধার্তের ক্ষুধা নিবারণে এক মুঠো খাবার না দিয়ে উদরপুর্তি করার জন্য ভান্ড পুরে নিয়ে যায়।
তাবত দুনিয়ার সকল মানুষের দৃষ্টি দূরের দিকে। আপনায় দৃষ্টিপাতের দিশা করে না কেউ। তাই একই দোষে দায়ী ব্যক্তি সমরুপ কারণে অন্যের দোষ আলোকপাত করে চলে অবিরত যে দোষে তার নিজের দায় রয়েছে সমান। মানুষের চোখ নিজেরে দেখে না। তার জন্য প্রয়োজন দর্পণ যা হৃদয়ের গহীনে বোধে জাগ্রত করতে হয়। দোষে গুণে মানুষ। যে অন্য ভুল ধরিয়ে দিলে শুধরে নেয় সে মানব, যে নিজের দর্পণে নিজেরে দেখে সে মহামানব, যে নিজের দোষ দেখে না সে অন্ধ মানব। আর যে নিজের দোষ না দেখে অন্যের দোষ অন্বেষণ করে সে নিকৃষ্ট মানব।
স্বার্থবাদী মুদিওয়ালা বলে বেড়ায় – ডাক্তার হাসপাতালে রোগী দেখে না ক্লিনিকে দেখে, মাছ-সব্জির দোকানী খাদ্যে ভেজাল দেয়। ডাক্তার, মাছ-সব্জির দোকানী বলে- মুদি মজুতদারী করে পণ্যের দাম বাড়ায়। বাসের হেল্পার বলে- তেল-গ্যাসের দাম বেশি, জায়গায় জায়গায় চাঁদা-মাসিক বখরা দিতে হয়। আমজনতা বলে- লিটারে বেড়েছে পাঁচ টাকা, জনপ্রতি ভাড়া বেড়েছে দশ টাকা। মজুতদার বলে-মহারাষ্ট্রের বাজারে পিঁয়াজের দাম বেড়েছে বলে দেশে পিঁয়াজের দাম বাড়তি। আমজনতা বলে- ওই পিঁয়াজ আমদানিতে তিন মাস লাগবে, এখন কেন বাজারে আগুন। আমরা শুধু অন্যের দোষ খুঁজতে অভ্যস্ত নিকৃষ্ট মানব, নিজের দোষ তালাশ করে উতকৃষ্ট মানব হওয়ার ইচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ নয় আমাদের কাছে। খেয়াল করার অবকাশ নেই যে, আমরাই মুদি, আমরাই আড়তদার, আমরাই মজুতদার, আমরাই ডাক্তার। আমরাই পুলিশ, বণিক শ্রেণি, পরিবহন মালিক, আমরাই খাদ্যে ভেজাল দেয়া মাছ-সব্জি-ফল বিক্রেতা। অফুরন্ত সময় হাতে অন্যের দোষ খুঁজবার নিজের দোষ খুঁজবার একটুকু ফুরসত আমাদের নেই। আমাদের ভালবাসার আবেগ নেই, কল্যাণ সাধনের স্বপ্ন নেই।
আমি স্বপ্ন দলিত মথিত করে সাধ, নির্যাসহীন জীবন বয়ে বাঁচতে চেয়েছি সৌভাগ্যের পরাকাষ্ঠার পরশ বিনে। আমারে যদি আমি না চিনি তবে কে রাখবে চিনে? ভালবাসা দিয়ে আমি দুঃখ লয়েছি কিনে। আমি আবদ্ধ হই নি উত্তমর্ণে। কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ হই কারণে অকারণে আসা দুঃখ সমাহারে। আমি আকাঙ্খিত প্রেমকে বার বার জলাঞ্জলি দিয়েছি কুন্ঠিত মনে।
কেউ গান করে মান মান অর্জন করে, কেউ মানের নেশায় গানে মাতে। আমি এর কোনোটাই চাই না। কেউ খেটে ঘেমে জাতির সমৃদ্ধি বয়ে আনে, কেউ বুদ্ধিবৃত্তিক অপচর্চা করে জাতির বুকের রক্ত চুষে খায়। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বুদ্ধিজীবিরা অনর্থের জন্য সব কিছুই করে। আমি এদের এড়িয়ে চলি। আমি খেটে খাওয়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি প্রাপ্য যা তার চেয়ে বেশি পাওয়ার আকাঙ্খাকে এড়িয়ে।
আমি দুঃখবিলাসে প্রশান্তচিত্তে নাকাল হতে চেয়েছি পরমতৃপ্তিতে। নিয়ত অপূর্ণতায় স্বপ্নহীন সম্পূর্ণতা অর্জনে বর্জন করেছি কল্পণার ফানুস। প্রয়সীকে বার বার বলতে চেয়েছি, ‘সখী, আমাতে প্রেম চেয়ো না, এ অন্তর বিরাণভূমি। ভালবাসা চেয়ো না এ মনে ভালবাসা নেই। এখানে শুধু নিঃসঙ্গতা, বিরহ, বঞ্চণা, আঘাত রয়েছে’। শুভকামনার অনর্থক বাণে আগ্রহ পাই নি কাউকে খুশি করার জন্য।
দেদীপ্যমান সূর্যের সামনে বক্ষ উন্মুক্ত করে দিয়েছি পুড়ে যাওয়ার জন্য। রুপালি চাঁদকে সঙ্গী করেছি না বলা কথাগুলো বলার জন্য। আঁধার রাতে কোটরের আখির সীমাবদ্ধতায় সঙ্গ খুঁজে নিয়েছি নিজের করে। নিঃসঙ্গ পথে আমি সঙ্গী খুঁজি নি পথচলার জন্য। ঝর ঝর বরষণে লোনাজলে সিক্ত অশ্রু ধুয়ে ছুটে চলি প্রাণের উচ্ছ্বাসে।
কথাগুলো এই জন্য বলা- আমি কেন নজরুলপ্রেমি হলাম কিংবা সাহিত্যে তার প্রভাব আমার উপর কেন বেশি সে বিষয়টি তুলে ধরা। হতে পারে আমার দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা কিংবা অন্য কিছু। বাংলা সাহিত্যে দুজন লেখক আমার মনস্তত্ত্বকে বেশি দুলিয়েছে। একজন অল্প লেখা দিয়ে চিন্তাকে ইতিবাচক হতে সাহায্য করেছে, তিনি ডাঃ লুতফর রহমান। আরেকজন তিনি যার উপলক্ষ্যে এ জমায়েত- তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলাম। প্রতিটি মানুষ তার মনস্তত্ত্বের প্রতিধ্বনি শুনতে চায়, অর্থাত বার বার তার বোধ ও ভাবনার ব্যঞ্জণার প্রতিধ্বনি শুনতে চায়। এ সত্যটা অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের সত্যবঞ্চণার কারণ হয়।
মানুষের মনস্তত্ত্বকে যে ফুটিয়ে তুলতে পারে তাকে তার আপন মনে হয়, তার কথা শুনার জন্য সে তৈরি থাকে। এ কারণে কাজী নজরুল আমার কাছে একটা বিস্ময়। আমি যেমন দেখেছি, যেমন পেয়েছি, যাপিত জীবনে যে সত্যকে উপলব্ধি করেছি, ভন্ডের ভজনগীতে যে প্রবঞ্চণায় আহত হয়েছি, ধার্মিকের অধার্মিকতায় বিস্মিত হয়েছি তার নিখুঁত উপস্থাপনা, প্রতিবাদ, প্রত্যাখ্যান ফুটে উঠেছে কাজী নজরুলের লেখনিতে। তিনি ছিলেন সমাজের আলোকে একজন প্রতিবাদী, সংস্কারক।
তাকে জানলে তার প্রেমে পড়তে বাঁধ্য হবে যে কেউ। আমি নিখুঁত আঘাতে আহত হতে চেয়েছি বার বার। মানুষের কাছে আমার চেয়ে নেবার কিছুই নেই তবু বিদগ্ধ অন্তরে প্রেম, আশির্বাদ ফেরি করতে চেয়েছি নিয়ত। তাই নজরুলকে আমি একটু বেশি অনুভব করি।
মৃতপ্রায় প্রাণকে তিনি জাগিয়ে দিয়েছেন কথামালায়। মুক্তির স্বাদ ভুলতে যাওয়া জাতির প্রাণে সঞ্চার করেছেন মুক্তির আকাঙ্খা, যুগিয়েছেন শেকল ভাঙার শক্তি। নজরুল মানে মাথা নত না করা, নজরুল মানে স্বাধীনতার আকাঙ্খা। নজরুল প্রেমের ফেরিওয়ালা, বিরহী প্রাণের আর্তনাদ, ঘুমন্ত প্রাণে জেগে উঠার চেতনা, জীবন সংগ্রামের অগ্রনায়ক, সাম্যবাদের পতাকাবাহী। নজরুল মানে দেশপ্রেম, নজরুল মানে সৃষ্টি সুখের উল্লাস। তিনি বলেছেন-
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে
মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে
আজ সৃষ্টি -সুখের উল্লােসে।
তার কবিতা, প্রবন্ধ, গান, কথিকাগুলো এতটা নিখুঁতভাবে ধারালো ভাষায় সমৃদ্ধ শব্দের অলঙ্কারে সাজানো হয়েছে যে, কখনো অশ্রু গড়িয়ে পড়ে অঝোরে, কখনও উন্মাদ করে দেয় ঘুমিয়ে থাকা অন্তরকে, কখনও প্রেমহীন অন্তরে প্রেমের জোয়ার বইয়ে দেয়, ঘৃণ্য সাম্প্রায়িকতার উন্মাতাল হিংস্রতাকে টেনে এনে, কিংবা কোনো স্বামীহীন সন্তানের জননীর উপর পাশবিক অত্যাচার চালানো পুরুষের বিচারিক দম্ভকে তুলে ধরে মনের উপর যে ঝড় বইয়ে দিয়েছেন তা কেবল তার লেখনিতে সম্ভব হয়েছে।
কখনও সাম্যবাদ, কখনও মানব সন্তান জিন্দাবাদ, কখনও অত্যাচারীর খড়গ নিপাত যাক শ্লোগান তুলেছেন। কখনও আল্লাহর জিকিরে ধ্যানমগ্নতার গভীরে চলে গেছেন। কখনও শ্যামাসঙ্গীতে ভক্তি-ভাবের ব্যঞ্জণা তুলে ধরেছেন। চরম সাম্প্রদায়িকতার মাঝে অসাম্প্রদায়িকতার উতকর্ষতম নজির স্থাপন করেছেন। আমরা যখন মাধ্যমিকে পড়ি তখন আমাদের এলাকার হিন্দুদের অনেককে এলাকা ছাড়তে দেখেছি। তখন বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টা আমাদের খুব নাড়িয়েছিল। আমরা কথা বলার অবলম্বন করেছিলাম নজরুলকে। তার লেখা হিন্দু মুসলিমের ভ্রাতৃত্ব, সাম্য, সম্প্রীতির বিষয়গুলো এমন ভাবে উঠে এসেছে যে, তাকে ছাড়া কথা বলার মত যুতসই আর কোনো অগ্রপথিককে পাই নি। তিনি বলেছিলেন-
মোরা একই বৃন্তের দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান
মুসলিম তার নয়ন মনি হিন্দু তার প্রাণ
এক সে আকাশ মায়ের কোলে যেন রবি শশী দোলে
এক রক্ত বুকের তলে এক সে নারীর টান
অহিংসার অমর বাণী উঠে আসে তার কবিতায়-
উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ
আমরা বলিব সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ।
ধর্মব্যবসায়ীদের সেই কবে ধরে ফেলেছিলেন নজরুল! মানুষ কবিতায় তার সাবলীল বর্ণনা-
মসজিদে কাল শিরনি আছিল অঢেল গোস্ত রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটি।
মানুষকে তিনি অবস্থান দিয়েছেন সবার আগে। তার অমর লেখনি ছিল মানুষ-
“গাহি সাম্যের গান,
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নয়, নহে কিছু মহিয়ান।
কিংবা
আরতির থালা আর তসবির মালা আসিবে না কোনো কাজে
মানুষ করিবে মানুষের সেবা আর সব কিছু বাজে।
তার কবিতা, গানে হিন্দু ধর্মবিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। তার অনেক সমাদৃত গানের মধ্যে রয়েছে-
সখী সে হরি কেমন বল,
নাম শুনে যার এত প্রেম জাগে চোখে আনে এত জল।।
ব্রজ গোপী খেলে হরি, হরি ব্রজ গোপী খেলে হরি।।
হে গোবিন্দ রাখিও চরণে—
শ্যামা সঙ্গীতে তার অনন্য লেখনীর স্বাক্ষর রেখেছেন নজরুল। জনপ্রিয় শ্যামাসঙ্গীতের মধ্যে রয়েছে-
জগত জননী শ্যামা—
শ্মশ্মানে জাগিছে শ্যামা—
ও মা কালি সেজে ফিরলি ঘরে—
আমায় যারা দেয় গো ব্যথা–
মুসলিম ভক্তি বিশ্বাসকে তুলে ধরেছেন নিজের মত করে–
খোদা তোমায় দেখে হাজারো বার দোজখে যেতে পারি-
মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই–
আমি যদি আরব হতাম মদীনারই পথ–
আল্লাতে যার পূর্ণ ইমান কোথা সে মুসলমান–
আল্লাহকে যে পাইতে চায় হযরতকে ভালবেসে–
ওগো মা ফাতেমা ছুটে আয়, তোর দুলালের বুকে হানে ছুরি—
রোজ হাশরে আল্লাহ আমার–
মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে–
ঝিমিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের জাগরণে তার আহ্বান ছিল স্পষ্ট। তিনি লিখেছেন-
বাজিছে দামামা বাধ রে আমামা
শির উচু করি মুসলমান,
দাওয়াত এসেছে নয়া জমানার
ভাঙা কিল্লায় উড়ে নিশান।
নারীভক্তিতে তার প্রকাশ অনন্য প্রকাশ ছিল-
এ মহান বিশ্বে যা কিছু মহান চিরকল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।
সুরের বৈচিত্র, রাগের সমন্বয়, আবেগের আবেশী প্রকাশ, শব্দের অপূর্ব সমন্বয় তার গানে-
উচাটন মন ঘরে রয় না হিয়া—
চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না এ নয়ন পানে—
পরদেশি মেঘ যাও রে—
যাও মেঘ দূত দিও প্রিয়ার হাতে—
খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে–
মুসাফির মুছরে আঁখিজল, ফিরে চল আপনারে নিয়া–
এত জল ও কাজল চোখে পাষাণী আনলে বলো কে?
পদ্মার ঢেউ রে—
বুলবুলি নীরব নারগিস বনে, ঝরা বনো গোলাপের বিলাপ সনে—
আলগা করো গো খোপার বাঁধন–
লাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া, মজনু গো আখি খোল-
তার বাণী প্রধান গান— মোহর আমার নেই কিছুই, তবে তারার আলোয় আছে রুপালি আগুন, ভোরের আলোয় আছে সোনা শুধু, ভালবাসা চাইলে এসো নইলে একেবারে এসো না।
তার জাগরণী কবিতা, গানগুলো ছিল অন্য উচ্চতার—
কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট—
এই শিকল পরা ছল—
দুর্গম গিরি কান্তার—
বল বীর বল উন্নত মম শির–
চল চল চল উর্ধ্বগগনে বাজে মাদল—
বিনা চিকিতসায় মরে যাওয়া পুত্র শোকে নজরুল লিখেছিলেন-
বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে–,
ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি—
পালা গান, রুটির দোকান, সৈনিক জীবন, ভগবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কারাবরণ, নারগিসের সাথে বিয়ে, অভিমান করে চলে যাওয়া এসব আর নাই বললাম। শৈশব থেকে দারিদ্রের সাথে সংগ্রাম করে তার জীবন চলা জীবনের শেষ অবধি ছিল। সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় পথ্যাদি কেনার জন্য তাকে প্রায়ই বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হতো। কখনও দোকানী দু কথা শুনিয়ে বাকীতে সওদা দিত কখনও কটু কথা বলে ফিরিয়ে দিত। তবু তিনি মনুষ্যত্বের শ্রেষ্ঠত্বের আসন থেকে বিচ্যুত হন নি। জীবনের কঠিন এ সংগ্রামে তিনি নিজেকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি লিখেছেন-
হে দারিদ্র, তুমি মোরে করেছ মহান—
তিনি আমাদের নজরুল, বাংলা ও বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির দিশারী।
লেখক : মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন
ম্যানেজার (এসপিও ), সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, জয়পাড়া শাখা, দোহার, ঢাকা।
