ডেস্ক : নভেল কারোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্তদের চিকিৎসায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও অ্যাজিথ্রোমাইসিন ভালো ফল পাওয়া গেছে এমন খবরের ভিত্তিতে মানুষ ফার্মেসিগুলোয় ভিড় করছে ওষুধ দুটি কিনতে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ সেবন করা যাবে না, এতে ভয়ঙ্কর বিপদ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, ওষুধ দুটি করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় তৈরি করা হয়নি। অনেক ওষুধ আছে যে রোগের জন্য তৈরি করা হয়েছে তার পাশাপাশি অফ-লেভেল অন্য রোগের ক্ষেত্রেও কাজ করে থাকে। হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন হচ্ছে তেমনি একটি ওষুধ। এটি মূলত ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওপর হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন এবং অ্যাজিথ্রোমাইসিন গ্রুপের ওষুধ প্রয়োগ করে ভালো ফল পাওয়া গেছে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ওষুধ সেবন করা যাবে না।
সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন এবং অ্যাজিথ্রোমাইসিন গ্রুপের ওষুধ প্রয়োগ করে ভালো ফল পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান আমেরিকার সরকারি রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, দেশে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওপর এ গ্রুপের ওষুধ প্রয়োগ করে ভালো ফল পাওয়া গেছে। বর্তমানে দেশে ২০ হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার মতো ওষুধ তাদের কাছে মজুদ আছে। যেগুলো করোনার চিকিৎসায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিএমএইচে সরবরাহ করা হবে। কেউ এটি বাজারজাত করতে পারবে না। হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন যে কেউ যত্রতত্র ব্যবহারের দরকার নেই। করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এ ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।
গত সোমবার রাতে মগবাজার এলাকার একটি ফার্মেসিতে গিয়ে দেখা যায়, ৬০ বছর বয়সী আনোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তি অ্যাজিথ্রোমাইসিন কিনছেন। ফার্মেসির সেলসম্যান তার কাছে প্রেসক্রিপশন চাইলে সেটি বাসায় রেখে এসেছেন বলে জানান। ফার্মেসির সেলসম্যান প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়েটিক দেওয়া যাবে না বলে জানালে তিনি রাগান্বিত হয়ে ফার্মেসি থেকে বেরিয়ে যান। জানতে চাইলে ফার্মেসির সেলসম্যান বলেন, যে কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি নিষিদ্ধ। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে অনেকেই এসে অ্যাজিথ্রোমাইসিন খোঁজ করছেন। যারা আসছেন তাদের মধ্য বেশির ভাগ মানুষেরই প্রেসক্রিপশন নেই।
এদিকে বিষয়টি জানার পর থেকে দেশে অ্যাজিথ্রোমাইসিন ও হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের চাহিদা বেড়েছে। অনেকেই ফার্মেসিতে গিয়ে অ্যাজিথ্রোমাইসিন চাচ্ছেন। একই সঙ্গে মন্টিলুকাস, প্যারাসিটামল, কাশির সিরাপ, ফেক্সোফেনাডিনসহ আরও কিছু ওষুধের চাহিদা বেড়েছে। এসব ওষুধ সাধারণত সর্দি, জ্বর, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বর্তমানে মৌসুমি ফ্লুর কারণে বহু মানুষ সর্দি, জ্বর, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্টে ভুগছেন বিধায় বাজারের এসব ওষুধের বিক্রি বেড়ে গেছে। আবার সর্দি, জ্বর, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট আর করোনা ভাইরাসের লক্ষণ-উপসর্গে মিল থাকায় অনেকে এ জাতীয় ওষুধ কিনে বাসায় মজুদ রাখছেন। বাসার কারও করোনা ভাইরাসের লক্ষণ-উপসর্গ (যেমন জ্বর, সর্দি, হাঁচি, কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট) দেখা দিলে সেবন করতে পারেন। মানুষ করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত হলে বাসায় বসে সেবনের জন্য অ্যাজিথ্রোমাইসিন ও হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন বেশি পরিমাণ ক্রয় করলে বাজারে সংকট হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, অ্যাজিথ্রোমাইসিন অ্যান্টিবায়েটিক ও হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধ দুটি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসাসেবায় ব্যবহার করা যাবে এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। তবে করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে এটি কাজ করছে বলে অনেক দেশে ব্যবহার হচ্ছে। কিছু ওষুধ এক রোগের জন্য কাজ করলেও এর পাশাপাশি অফ লেভেলে অন্য রোগের ক্ষেত্রেও কাজ করে থাকে। হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন সে ধরনের একটি ওষুধ। এটি করোনা ভাইরাস রোগীর চিকিৎসায় কাজ করেছে বিধায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধ কাজ করে বিধায় যে কেউ ফার্মেসি থেকে কিনে এসে এটি সেবন শুরু করবেন বিষয়টি এমন নয়। আগে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়ে ওই ওষুধটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
অধ্যাপক খান আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, অ্যাজিথ্রোমাইসিন অ্যান্টিবায়েটিক সিভিআর নিউমোনিয়া রোগের ক্ষেত্রে কাজ করে। কিন্তু যদি সে রোগ না হয়ে থাকে তা হলে এটি কাজ করবে না। যে ওষুধ যে রোগের ক্ষেত্রে কাজ করে সেই রোগ না থাকলে ওই ওষুধ সেবন করার পর মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। মানুষ যদি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে মনে করে নিজে নিজেই ঘরে বসে অ্যাজিথ্রোমাইসিন ও হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন সেবন করতে থাকেন তা হলে ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে।
শিশু বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ বেসরকারি মেডিক্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও হলি ফ্যামিলি রেডক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভূইয়া বলেন, অ্যাজিথ্রোমাইসিন শ্বাসনালির প্রদাহের সময় ব্যবহার করা হয়। এটি নিয়ম মাফিক সেবনে কোনো সমস্যা নেই। তবে ওভার ডোজ হলে কিডনির সমস্যা হবে। হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন আমরা সেবনের পরামর্শ দেই। তবে এটি চিকিৎকের পরামর্শ ছাড়াই ব্যবহার করা ঠিক নয়।
