জ্বালানি সংকটেও জাতীয় গ্রিডে স্বস্তি দিচ্ছে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র

‎রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ ‎দেশের বিদ্যুৎ খাতের সংকটময় মুহূর্তে বাগেরহাটের রামপাল মৈত্রী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন ‎‎দেশের জ্বালানি সংকট ও তীব্র লোডশেডিংয়ের কবলে যখন জাতীয় গ্রিড বিপর্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে বাগেরহাটের রামপাল মৈত্রী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা প্রদর্শন করে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ২৫ দিনে কেন্দ্রটি প্রায় ৬৪ কোটি ৩৬ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট স্থাপিত ক্ষমতার এই কেন্দ্রটি উল্লিখিত সময়ে গড়ে এক হাজার ৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করেছে, যা বর্তমান চাহিদার নিরিখে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে জুন মাসে কেন্দ্রটি ৮২ কোটি ৭৩ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিল, যা গড়ে এক হাজার ১৪৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমতুল্য। মূলত উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখার এই ধারা জাতীয় গ্রিডের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে সরাসরি সহায়তা করছে এবং বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

‎বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অপারেশনাল কার্যক্রমের গভীর পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করাই বর্তমানে কেন্দ্রটির মূল চ্যালেঞ্জ। রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপব্যবস্থাপক খাঁন নোমান শিবলী জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যেখানে পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। ভুক্তভোগী গ্রাহক ও সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে, তবে রামপালের এই ধারাবাহিক উৎপাদন সেই আস্থার জায়গাটি পুনর্গঠন করছে। বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যদি কেন্দ্রটি একইভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে, তবে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে এবং শিল্পাঞ্চলসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতগুলোতে বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। রুট ডাইনামিক্স এবং জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন সংশ্লিষ্টদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত যাতে কোনোভাবেই উৎপাদন ব্যাহত না হয়।

‎প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জনবল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বর্তমানে একটি নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। কেন্দ্রটির মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা আনোয়ারুল আজিম জানিয়েছেন যে, বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের দক্ষ হাতে পরিচালিত হচ্ছে। আগে ভারতীয় প্রকৌশলীরা যে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করেছিলেন, তা এখন দেশীয় প্রকৌশলীরা আত্মস্থ করেছেন এবং তারা দক্ষতার সঙ্গে কেন্দ্রটির অপারেশনাল দায়িত্ব পালন করছেন। ভারতীয় প্রকৌশলীরা এখন কেবল উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার এক বড় অর্জন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক রমানাথ পূজারী আশ্বস্ত করেছেন যে, জাতীয় গ্রিডের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখা হবে এবং পরিবেশগত মানদণ্ড বজায় রেখে আগামী দিনেও কেন্দ্রটি তার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেন্দ্রটির নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যাতে জাতীয় গ্রিডে কোনো যান্ত্রিক বা লজিস্টিক বিঘ্ন না ঘটে।

‎রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের এই সফল পরিচালনা কেবল বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট নিরসনেই সহায়ক নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় বার্তা। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির সক্ষমতা ও দেশীয় প্রকৌশলীদের দক্ষতা প্রমাণ করে যে, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহার সম্ভব হলে বড় ধরনের জাতীয় সংকটেও সমাধান বের করা সম্ভব। আগামী দিনগুলোতে বিদ্যুৎ খাতের ওপর চাপ কমাতে এই কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা এবং রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়া আরও আধুনিকায়ন করা জরুরি। যদি রামপাল একইভাবে জাতীয় গ্রিডে শক্তির জোগান দিয়ে যায়, তবে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মিটিয়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গতিশীলতা বজায় রাখা সহজতর হবে, যা সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *