করোনায় নেই বৈশাখি ইলিশের উন্মাদনা

দুয়ারে কড়া নাড়ছে নতুন একটি বছর। চৈতালি হাওয়ার পালে চড়ে আবারও এসেছে বৈশাখ। রাত পোহলেই পহেলা বৈশাখ। উৎসবের রঙিন হওয়ার একটি দিন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির যুথবদ্ধ উৎসব উদযাপনের একটি দিন। কিন্তু এবার যেন কোথাও কোনও ছোঁয়া নেই বৈশাখের। নেই কোনও প্রস্তুতি কিংবা আয়োজন। রবি ঠাকুরের কবিতাকে একটু ঘুরিয়ে বলা যায়- ‘যা ছিল নিয়ে গেলো করোনা ভাইরাস’।  

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের যেকোনও অনুষ্ঠান আয়োজন কিংবা লোকসমাগম না করতে আগেই সরকারি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বারবার দেশবাসীকে বৈশাখ উদযাপনে কোথাও জড়ো না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় এবার পান্তা-ইলিশ নিয়ে নেই কোনও কথার চালাচালি। সামাজিকমাধ্যমগুলোও বৈশাখি আলোচনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বাঙালি শেষ কবে এমন ঘরে বসে বর্ষবরণ করেছে তা হয়তো লম্বা হিসাব কষেই বলতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের প্রথম সকালের প্রধান অনুষঙ্গ। এছাড়াও ঢাকাসহ সারা দেশে নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গ্রামে কিংবা শহরে- খোলা মাঠে বসে মেলা। বাহারি পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। নতুন পোশাকের ঘ্রাণ গায়ে জড়িয়ে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা কে না আসে বৈশাখি উৎসবে মাততে। 

কিন্তু এবার চিত্রটা পুরো ভিন্ন। এর বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে ইলিশের বাজারেও। আজ বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। অথচ বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে অন্যান্য বছরগুলোতে এই সময়ে গোটা দেশে কয়েকগুণ বেড়ে যায় ইলিশের দাম। সোনার হরিণ হয়ে উঠা ইলিশ নিয়ে গণমাধ্যমেও খবরের ছড়াছড়ি থাকে। এবার এসবের কোনোটাই নাই। দাম যতই হোক, কিনতেই হবে ইলিশ- করোনায় এবার সেই উন্মাদনাও নেই মানুষের।

অন্যান্য বছর বৈশাখী উৎসব শুরু হতে না হতেই মাছের আড়তগুলোতে লাগতো ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। পদ্মার সুস্বাদু ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় বাজারে ইলিশের দামও হয়ে যেতো আকাশচুম্বি। আধা কেজি ওজনের একখানা ইলিশের দাম উঠতো ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। এবার ইলিশে লাগেনি বৈশাখি হাওয়া।

রাজধানীর এক বাসিন্দা করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকাতেই আছেন। তিনি বলেন, ‘বৈশাখে ছেলেমেয়েদের নতুন জামা-কাপড় কিনে দিই। এবার পারছি না। ঘর থেকেই তো বের হওয়া যায় না। বৈশাখ এলে ইলিশ নিয়ে বাজারে কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায়। এবার বাজারেই যেতে পারিনি। ইলিশও কেনা হবে না। ঘরে বসেই নববর্ষের দিনটা কাটাতে হবে।’ 

পহেলা বৈশাখে দেশের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতিটা থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। প্রায় মাসখানেক আগে থেকেই চারুকলায় নানা রঙে ও ঢঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর অবয়ব তৈরির ধুম পড়ে। গোটা বিশ্ববিদ্যারয়েই লাগে রঙ। এবার বৈশাল এসেছে, তবে ক্যাম্পস এখন সুনসান। চারপাশে যেন বর্ণগন্ধহীন এক শূন্যতা। 

তাহমিনা নোভা নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাস ছেড়ে দিয়েছি অনেক দিন আগে। করোনা ভাইরাসের কারণে পুরো ক্যাম্পাস এখন ফাঁকা। ভাবতেই খারাপ লাগছে। বৈশাখে কতকিছু প্ল্যান ছিল। কিন্তু কিছুই হলো না। খুব খারাপ লাগছে। বন্ধুদের খুব মিস করছি।’ 

উৎসবের দিনগুলোতে কাছের মানুষের সান্নিধ্য আনন্দকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তারপরও আমরা আছি সামাজিক-শারীরিক দূরত্বে। নিজেকে ও নিজের চারপাশের মানুষকে নিরাপদে রাখতে সঙ্গত্যাগই এখন মূলমন্ত্র। বরং এই বৈশাখে সান্ত্বনা হিসেবে আমরা ঘরে থেকে কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো করে অনর্গল বলে যেতে পারি- ‘সহে না সহে না আর জনতার জঘন্য মিতালী’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *