দোহার-নবাবগঞ্জের রাজনীতির হালচিত্র: ত্যাগীরা পিছিয়ে পড়ছে ক্রমশ

অ্যাডভোকেট মনির হোসেন রানা:  জাতীয়তাবাদী শক্তির তীর্থভুমি খ্যাত দোহার নবাবগঞ্জ এলাকায় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সুচনা হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্টজন তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রী ও সাবেক নৌবাহিনী প্রধান ক্যাপ্টেন (অব:) মরহুম নুরুল হক সাহেব এবং নবাবগঞ্জের কৃতি সন্তান উচ্চ শিক্ষিত, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মরহুম আতাউদ্দিন খান সাহেবের হাত ধরে। অবশ্য তখন‌ও তরুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বিএনপির ১ম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে শহীদ জিয়ার রাজনীতি দোহার নবাবগঞ্জ এলাকায় পৌঁছে দিতে সক্রিয় ছিলেন।
শহীদ জিয়ার সরকারের সময় ছিল একেবারেই অল্প। তবে এই সময়ের মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা তৃনমূলে পৌঁছে যায় এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে তা ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়।
দোহার-নবাবগঞ্জ অঞ্চলে শহীদ জিয়ার রাজনীতিকে জনতার দৌড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে তৃনমুলে অক্লান্ত প্ররিশ্রম করেছেন তৎকালীন স্থানীয় নেতা মরহুম সিরাজ মিয়া, এম এ সাত্তার, ইসলাম খান সাহেব এবং আবেদ হোসেন। তাদের ৩ জন মৃত্যু বরন করেছেন। উনাদের বিদেহী আত্নার মাগফিরাত কামনা করছি এবং আবেদ ভাইয়ের দীর্ঘ হায়াত কামনা করছি।
বলে রাখা ভালো মরহুম সিরাজ মিয়া শেষ অবদি জাতীয়তাবাদী আদর্শে অবিচল থাকতে পারেন নাই।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্ৰামে শাহাদাৎ বরণ করলে সারা বাংলাদেশের মতো দোহার-নবাবগঞ্জ এলাকায়‌ও বিএনপির রাজনীতি থমকে দাড়ায়।
মরহুম নুরুল হক সাহেব, মরহুম আতাউদ্দিন খান সাহেব মুল ধারার রাজনীতি ছেড়ে উপধারায় সংযুক্ত হলে ধীরে ধীরে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ঢাকা জেলা বিএনপির রাজনীতিতে গতির সঞ্চার করেন।
তবে নিরেট বাস্তবতা হচ্ছে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের দিন গুলোতে দোহার-নবাবগঞ্জ অঞ্চলে বিএনপি অপেক্ষা শতভাগ অগ্ৰগামী ছিল বিএনপির অংগ সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
তৎকালীন সময়ে ডিএন কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি ও ছাত্রদল নেতা হারুন-অর-রশিদ ওসমানী (হারুন ভাই) কে কেন্দ্র করে ডেডিকেটেট একঝাঁক ছাত্রনেতা জাতীয়তাবাদী আদর্শকে একেবারে তৃণমূলে সবার অলক্ষ্যেই পৌঁছে দেয়।
স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে ভোটের ফলাফল এবং ধানের শীষ নৌকার বিশাল ব্যবধান এই অঞ্চলের সুধী মহলে বেশ খানিকটা ঝাঁকি দিয়ে দেয়।
ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বিএনপির পুরনো নেতা এবং সদ্য দলে আসা মার্জিত, রুচিশীল, বিদেশে উচ্চ শিক্ষিত, দায়িত্বশীল জ্ঞানী মানুষ মান্নান সাহেব এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন থিওরীর সফল প্রয়োগ করে দলে এবং এলাকায় বিপুল জন সমর্থন অর্জন করেন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে গ্ৰহণযোগ্য ১৯৯১ সনের সংসদ নির্বাচনে দেশনেত্রী বেগম খালদা জিয়া বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে সেই সরকারে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা পূর্ণমন্ত্রী এবং মরহুম আব্দুল মান্নান সাহেব প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে এলাকার উন্নয়নে ২ জন মন্ত্রী মনোনিবেশ করেন। পাশাপাশি দোহার-নবাবগঞ্জ অঞ্চলে একঝাঁক তরুন, Smart, ডেডিকেটেট ছাত্রনেতা আন্তরিক ভাবে বিএনপি’র উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি তৃণমূলে পৌঁছে দিয়ে উন্নয়নের সুফল ভোগীদের জাতীয়তাবাদী ঘরোনার রাজনীতির অংশীজন করে তুলেন। সেই বন্ধনে আবদ্ধ বর্তমানে প্রবীণ হয়ে যাওয়া মাঠকর্মীরা আজ‌ও বিএনপি’র মূলধন এবং নি:স্বার্থ বিএনপি প্রেমী।
ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল দেশনেত্রী বেগম খালেজা জিয়া তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মেনে নিয়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেন।
পরবর্তি সংসদ নির্বাচনে দোহার-নবাবগঞ্জে জাতীয়তাবাদী শক্তি বিজয়ী হলেও জাতীয় পার্টির সমর্থনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং এই সময়ে দোহার-নবাবগঞ্জের আম-জনতা উপলব্দি করেন যোগ্য, সৎ ও উন্নয়নের প্রশ্নে আপোষহীন জাতীয়তাবাদী নেতা ভিন্ন তাদের আপনজন অন্য কোথাও নেই।
আমজনতা ২০০১ এর সংসদ নির্বাচনে নৌকার কালো টাকার মালিক ভাড়াটে প্রার্থীদের দোহার-নবাবগঞ্জ থেকে প্রত্যাখান করে আবারো প্রমাণ করেন দোহার-নবাবগঞ্জের মাটি শহীদ জিয়ার ঘাটি।
২০০১ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া পূণরায় সরকার গঠন করলে ঐ সরকারে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে এই অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবী দোহার-নবাবগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন করে জনতার মনে স্থায়ী আসন করে নেন। পাশাপাশি সংসদে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে জনাব আব্দুল মান্নান সাহেব  টপ মোস্ট দায়িত্বশীল সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় ইমেজ তৈরী করে ফেলেন।
২ জন জাতীয় নেতার দিক নির্দেশনায় দোহার-নবাবগঞ্জ এলাকার বিএনপি ঈর্শ্বনীয় উচ্চতায় পৌঁছে যায়।
কালের পরিক্রমায় বিএনপির আঞ্চলিক নের্তৃত্বে পরিবর্তন আসে। ২ জন জাতীয় নেতাই পরলোক গমন করেন। যদিও এক‌ এগারোর দানবীয় সরকারের ফাঁদে পরে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাকালীন জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা জীবনের শেষ সময়ে বিএনপি থেকে দূরে চলে যান। তথাপি তিনি কখ‌নও কোন দলীয় কর্মীকে বিএনপি ছেড়ে তাঁর দলে ভিড়তে বলেননি। তাঁর অফিস, বাস ভবনসহ সকল স্থানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছবি যত্নের সাথে সংরক্ষণ করে তিনি ম্যাসেস দিয়েছেন তিনি আমৃত্যু বিএনপির’ই লোক ছিলেন।
আওয়ামী ফ্যাসিজমের ১৭ বছরে দোহার-নবাবগঞ্জের বিএনপি এগিয়েছে বটে। তবে প্রাণের টানের ঘাটতি ব্যাপক দৃশ্যমান। কর্মীদের নেতা আছে, অভিভাবক নেই।
স্বপ্নচারী,ভিশনারী নেতার অভাবের দীর্ঘশ্বাসে ভারী দোহার-নবাবগঞ্জের জনপথ।
অতি সাম্প্রতিক সময়ে একজন সাবেক ছাত্রনেতার বক্ততায় স্বজন প্রীতির যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে তা খুব‌ই উদ্বেকজনক। জাতীয়তাবাদী শক্তির ৫০ বছরের অর্জনে উঁইপুকা ধরেছে। বাতাসের মৃদ্যু গুঞ্জন ক্রমস্য জোড়ালো হচ্ছে। ত্যাগীরা পেছনে পরে যাচ্ছেন। সাধু সাবধান।  লড়তে হবে বিদেশে উচ্চ শিক্ষিত একজন জাতীয় ফিগারের প্রতিকুলে।
অ্যাডভোকেট মনির হোসেন রানা
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *