মো. রফিকুল ইসলাম, ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় সরকারি ধান কাটার রিপার মেশিন বিক্রির অভিযোগে শোকজ হওয়া উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে তদন্তে আংশিক ভুল বোঝাবুঝির বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা ভুলবশত রিপার মেশিনটি এমন এক ব্যক্তির নামে বিতরণ করেছিলেন, যিনি একই ইউনিয়নের অন্য একটি দলের সদস্য হলেও অভিযোগকারীদের দলের ছিলেন না। পরবর্তীতে ভুল বুঝতে পেরে মেশিনটি অফিসে ফেরত আনা হয় এবং যথাযথ দলের নিকট পুনরায় হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনাটি ভূরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই ইউনিয়নের দক্ষিণ তিলাই এলাকায় ঘটে। অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে তদন্তে জানা যায়, রংপুর বিভাগ কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিতরণকৃত রিপার মেশিন (মডেল: CHINA 4G 120AB, ইঞ্জিন নম্বর: 170F-24110037, পাওয়ার: 6HP, চেসিস নম্বর: 202505055) ‘দক্ষিণ তিলাই পূর্বপাড়া ফল উৎপাদক দল’-এর নামে বরাদ্দ ছিল।
কিন্তু ভুলবশত মেশিনটি বিতরণ করা হয় দক্ষিণ তিলাই গ্রামের রিপন মিয়ার নামে, যিনি আসলে এসএসিপি-রেইনস প্রকল্পভুক্ত দলের সাধারণ সম্পাদক, তবে ‘দক্ষিণ তিলাই পূর্বপাড়া ফল উৎপাদক দল’-ভুক্ত নন।
রিপন মিয়া বলেন, “মেশিন পাওয়ার কিছু দিন পর অভিযোগকারীরা আমার কাছে আসে এবং মেশিনটি তাদের দলের জন্য বরাদ্দ জানায়। মেশিনটি তারা চাইলে আমি জানাই যেহেতু অফিসিয়াল প্রক্রিয়ায় মেশিন দিয়েছে, তাই অফিসিয়াল ভাবেই নিতে হবে। তারা চলে যায় এবং পরে জানতে পারি টাকার বিনিময়ে নাকি মেশিন নিয়েছি এমন অভিযোগ করেছে। আমি সরকার থেকে ফ্রি মেশিন পেয়েছিলাম, কোনো টাকাও দেইনি। পরে যখন অফিস থেকে জানানো হয় যে মেশিনটি ভুলবশত আমার কাছে দিয়েছে, তখন আমি তা তথ্য যাচাই করে কৃষি অফিসের প্রক্রিয়াতেই মেশিনটি ফেরত দিয়েছি।”
দক্ষিণ তিলাই পূর্বপাড়া ফল উৎপাদক দলের সাধারণ সম্পাদক বাদশা আলমগীর বলেন, “আমাদের দলের নামে বরাদ্দ মেশিন না পেয়ে অভিযোগ করি। পরে জানতে পারি দুই প্রকল্পের দলে একই নামে রিপন মিয়া আছেন, সেখান থেকেই ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। অফিসে মেশিন ফেরত আসার পর আমাদের দলে দিয়েছে এবং আমরা তা পেয়েছি। পরে অভিযোগটি লিখিতভাবে প্রত্যাহার করেছি এবং ডিডি স্যারকেও জানিয়েছি।”
দক্ষিণ তিলাই পূর্বপাড়া ফল উৎপাদক দলের সভাপতি আজিজুল হক বলেন, “অফিস থেকে মেশিনটি আমাদের দলে দেওয়ার সময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা কৃষি অফিসার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এটি বিক্রির কোনো ঘটনা নয় বরং ভুল দলে বিতরণ হয়েছিল। তিনি ইতিপূর্বে তার দলের জন্য একটি ধান মাড়াই যন্ত্র (বোঙ্গা) নিয়েছিলেন, সেখানে কোনো টাকা দেওয়া লাগে নাই। আমরা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে অভিযোগটি প্রত্যাহার করেছি।”
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল খালেক বলেন, অত্র উপজেলায় জানুয়ারি/২৫-এ যোগদানের পর বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের দায়িত্ব পান। প্রায় তিন মাস পর তিলাই ইউনিয়নের দুইজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মনজুরুল ইসলাম ও লোহানি শাহ নেওয়াজকে বদলি করে তৎস্থলে তাকে দক্ষিণ ছাট গোপালপুর এবং পশ্চিম ছাট গোপালপুর ব্লকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব পালন করার অবস্থায় কিছু দিন পর দক্ষিণ তিলাই ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আসিফ বিন রশীদ সাময়িক বরখাস্ত হলে তদস্থলে তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ তার নিকট তখন একটি ইউনিয়নের সম্পূর্ণ দায়িত্ব অর্পিত হয়। এমতাবস্থায় রাডারডিপি প্রকল্পের অধীনে রিপার মেশিন বিতরণের বরাদ্দ আসলে পূর্বে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় রাডারডিপি প্রকল্পসহ বেশ কিছু প্রকল্পের দলের কাগজপত্র তাকে হস্তান্তর না করার কারণে কে কোন দলের সদস্য তা নির্ধারণে সমস্যা হয়েছে।
তার কাছে রাডারডিপি প্রকল্পের কোনো তথ্য না থাকার কারণে পূর্বে কর্মরত মোঃ মনজুরুল ইসলামের নিকট মৌখিকভাবে কাজের সহযোগিতা ও রিপার যন্ত্র গ্রহণে দল/আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যে রিপন নামের ব্যক্তিকে নির্বাচন করে তার তথ্য নেওয়ার পরামর্শ দেন। “রিপার মেশিন বিতরণের সময় রিপন মিয়া দলের সিল না আনায় এবং নতুন করে সিল তৈরি করায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি দুটি প্রকল্প দলের তালিকায় ‘রিপন মিয়া’ নামের ব্যক্তি দুই দলেই থাকায় ভুলবশত দক্ষিণ তিলাই পূর্বপাড়া ফল উৎপাদক দলের নাম ব্যবহার হয়ে এসএসিপি-রেইনস প্রকল্প দলের সাধারণ সম্পাদক রিপন মিয়া যন্ত্রটি পান। বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ উঠলে আমি দুই দলের তথ্য যাচাই করে ভুল হওয়ার বিষয়টি জানতে পারি। পরে উপজেলা কৃষি অফিসার যন্ত্রটি ফেরত চাইলে তিনি তিলাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় রিপনের নিকট বিতরণকৃত রিপার মেশিনটি ফেরত নিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় অফিসে জমা দেন।”
তিনি আরো বলেন, যন্ত্র জমা হওয়ার দিন অর্থাৎ ০৮/১০/২৫ইং তারিখে বিকেলে রেখা ও আব্দুর রাজ্জাক কাজল নামের সাংবাদিক পরিচয়ে তার সাক্ষাৎকার নিতে ফোন দেন। কিছুক্ষন পর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে পর্যায়ক্রমে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান ও অফিসের গাড়ির ড্রাইভার বাবু ফোন দিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুল জব্বারের বরাত দিয়ে ফোনে জানান, যে সাংবাদিক এসেছে তাকে সম্মানি দিতে হবে। এর মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটার পরে সর্বশেষ উপজেলা কৃষি অফিসের চাপের কারণে আনুমানিক রাত ৭.৩০ ঘটিকায় উপজেলা অফিসের চত্বরে সাক্ষাৎকার দিতে হয়েছে।
তিনি আরও জানান, “পরবর্তীতে ০৯/১০/২০২৫ইং উপজেলা নির্বাহী অফিসার দীপ জন মিত্র, উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ আব্দুল জব্বার এবং উক্ত ব্লকে বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ জাহাঙ্গীর আলমসহ বেশ কিছু অভিযোগকারীদের উপস্থিতিতে রিপার মেশিনটি দক্ষিণ তিলাই পূর্বপাড়া ফল উৎপাদক দলের নিকট হস্তান্তর করা হয়। মেশিন পেয়ে অভিযোগকারীরাও তাদের অভিযোগটি লিখিতভাবে প্রত্যাহার করেছেন বলে জানা যায়।”
তিনি আরও বলেন, “ঘটনাটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। মেশিন বিতরণে কোনো অর্থ লেনদেন হয়নি। উক্ত প্রকল্পের সকল তথ্য না থাকার কারণে কাজে ভুল হওয়ায় অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। বর্তমানে তিনি ভূরুঙ্গামারী সদর ইউনিয়নের বাগভান্ডার ব্লক এবং দেওয়ানের খামার ব্লকে অতিরিক্ত দায়িত্বে কর্মরত আছেন।”
উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ আব্দুল জব্বার বলেন, “ঘটনাটি ভুল বোঝাবুঝির কারণে ঘটেছিল। তদন্তে বিক্রির কথা অভিযোগ করলেও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বর্তমানে মেশিনটি যথাযথ দলের কাছেই রয়েছে এবং অভিযোগকারীরা তাদের অভিযোগ প্রত্যাহার করেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অভিযোগ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে মর্মে জানায়। ”
রিপার মেশিন বিতরণের সময় যেহেতু ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ডিড করে দেওয়া হয়, যেখানে যন্ত্র গ্রহণকারী ২য় পক্ষ এবং ১ম পক্ষে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাক্ষী হিসেবে থাকেন এবং নথি যাচাই-বাছাইয়ের পর উপজেলা কৃষি অফিসার অনুমোদন দেন। সে ক্ষেত্রে এই ভুল হলে শুধু উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নয়, উপজেলা কৃষি অফিসারেরও দায়ভার থাকে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুনের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঢাকায় সাত দিন থেকে ছুটিতে আছেন। বিষয়টি জেনেছেন এবং রিপার মেশিনটি ভুলবশত অন্য দলে দিয়েছিলো এবং অভিযোগের পর তা সঠিক দলে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ হয়েছে, তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং যেহেতু স্ট্যাম্পে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি অফিসার স্বাক্ষর দিয়েছে, সে ক্ষেত্রে দুইজনেরই দায়বদ্ধতা থাকে মর্মে জানান।
স্থানীয় কৃষকরা বলেন, এই ধরনের ঘটনায় কৃষকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তর দ্রুত তদন্ত ও পদক্ষেপ নেওয়ায় সমস্যার সমাধান হয়েছে।
