নিয়ন্ত্রণহীন ওষুধের বাজার: ইচ্ছামতো দাম বাড়ায় কোম্পানিগুলো

দেশের ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন। যখন-তখন ইচ্ছামতো দাম বাড়ায় কোম্পানিগুলো। চলতি বছরের শুরুতে একবার বেড়েছে বিভিন্ন ওষুধের দাম।

তারপর সারা বছর একটি-দুটির করে দাম বাড়লেও বছরের শেষদিকে ব্যাপক বেড়েছে মৃত্যুসঞ্জীবনী এ পণ্যের মূল্য। নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হয়ে এক্ষেত্রে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ওষুধের দামের ক্ষেত্রে বাজার অর্থনীতির সুবিধা নিচ্ছে। অথচ মৃত্যুসঞ্জীবনী পণ্যের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। তাছাড়া ভোগ্যপণ্যের মতো ওষুধের বাজার প্রতিযোগিতামূলক নয়।

পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আউট অব পকেট (রোগীর অতিরিক্ত খরচ) ব্যয় হয় এ দেশের মানুষের। যার দুই-তৃতীয়াংশই ব্যয় হয় ওষুধের পেছনে। তাই সরকারের এক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

সূত্র মতে, আড়াই হাজারের বেশি ওষুধ দেশে উৎপাদন বা পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করে থাকে কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে মাত্র ১১৭টির মূল্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বাকিগুলোর মূল্য নির্ধারণে সরকারের তেমন কোনো ভূমিকা নেই।

১৯৯৪-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় বলা হয়, অত্যাবশ্যকীয় তালিকাবহির্ভূত ওষুধের দাম নিজ নিজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করবে। ২৪ বছর আগের সেই নির্দেশনার বলে ইচ্ছামতো দাম বাড়ায় কোম্পানিগুলো। অথচ ১৯৮২ সালের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশে যে কোনো ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সরকারের ছিল।

তবে সেটি বাতিল করে প্রণীত ২০১৬’র নীতিমালায় সেই ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলো যে দাম চাইছে, ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর সেই দামেই বিক্রির অনুমতি দিচ্ছে। ফলে ওষ–ধের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি থেকে যাচ্ছে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই মাহবুব বলেন, আমাদের ক্ষমতা নেই এ কথা বলে ঔষধ প্রশাসন বসে থাকতে পারে না। ওষুধের দাম বাড়লে অবশ্যই তার যৌক্তিকতা থাকতে হবে। তাছাড়া ওষুধনীতিতে তাদের যথেষ্ট ক্ষমতা দেয়া আছে, যেটার ব্যবহার করতে হবে। কোম্পানির স্বার্থ দেখা তাদের কাজ নয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমান খসরু বলেন, যে ১১৭টি ওষুধ সরকার নিয়ন্ত্রণ করে তার অর্ধেকই এখন আর ব্যবহার হয় না। তাই ৯৫ ভাগ মানুষের সুস্থতার জন্য যেসব ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোর মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।

রাজধানীর মিটফোর্ডের পাইকারি ওষুধের বাজার ও খুচরা ওষুধ বিক্রেতারা জানান, সম্প্রতি সবচেয়ে দাম বেড়েছে ইনসুলিনের। এছাড়া হৃদরোগ, ক্যান্সার ও হেপাটাইটিসের ওষুধের দাম বেড়েছে। এক্ষেত্রে এক হাজার টাকার ইনসুলিন বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার টাকায়। ডায়াবেটিস রোগীদের বিভিন্ন ধরনের ট্যাবলেটের দাম বেড়েছে ৯ থেকে ২০ টাকা।

কার্ডিও ভাসকুলারের যে ওষুধের এক প্যাকেটের দাম ছিল ৬০ টাকা, তার বর্তমান মূল্য ১৫০ টাকা। হেপাটাইটিস (বি+সি) কম্বিনেশন এক হাজার টাকার ওষুধ বিক্রি হচ্ছে আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা। এমনকি সম্প্রতি আবহাওয়ার শুষ্কতার কারণে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের কাশির সমস্যা বেড়েছে। সে কারণে কাশির ওষুধেরও দাম বেড়েছে। এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক কোম্পানিগুলোও।

রাজধানীর তেজগাঁও, মহাখালী ও মিটফোর্ডের ওষুধের দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওষুধের দাম ওষুধের প্রতিটি পাতায় (ট্যাবলেট ও ক্যাপসুলের ক্ষেত্রে) লেখা থাকে না। লেখা থাকে ৫ পাতা বা ১০ পাতার ওষুধের একটি বাক্সে।

সাধারণত ক্রেতাদের বাক্সভর্তি ওষুধের প্রয়োজন না থাকায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা প্যাকেটের গায়ের দাম দেখার সুযোগ পান না। তাছাড়া অন্যান্য পণ্যের মতো ওষুধের দাম সম্পর্কে রোগীদের সুস্পষ্ট ধারণা থাকে না বা দামাদামির ঘটনাও খুব বেশি হয় না।

সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ ওষুধ কেনে জীবন বাঁচাতে এবং শারীরিক সুস্থতার জন্য। প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে এভাবেই প্রতিদিন অধিক মূল্যে ওষুধ কিনতে বাধ্য হন রোগীরা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ক্যামিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির পরিচালক (২০১৬-১৮) জাকির হোসেন রনি বলেন, সম্প্রতি একটি বিদেশি কোম্পানি তাদের ব্যবসা বন্ধ ঘোষণা করায় অনেক ওষুধের দাম বেড়েছে। এক্ষেত্রে কোম্পানি ও বিক্রেতাদের মধ্যে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, বিদেশি কোম্পানিটির প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার ওষুধ বাজারে আছে। যার উপযোগিতা বেশি হওয়ায় এগুলো বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু দেশি ওষুধের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। তা সত্ত্বেও সেগুলোর দাম বেড়েছে।

এ প্রসঙ্গে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো ওষুধের দাম বাড়ানো হয়নি। তবে বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে দাম বৃদ্ধির কিছু আবেদন যাচাই-বাছাই চলছে। দোকানিরা দাম বাড়িয়ে থাকলে বিষয়টি প্রশাসনের জানা নেই।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে ওষুধের দাম বাড়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এমনকি কাঁচামালের (এপিআই) বাজারও স্বাভাবিক রয়েছে। তারপরও ক্যান্সারের কেমোথেরাপির ওষুধের দাম সম্প্রতি বেড়েছে।

সূত্র মতে, ক্যান্সার চিকিৎসায় কেমোথেরাপিতে প্রয়োজনীয় ডসেটিক্সেল, প্যাক্লিটেক্সেল, কার্বোপ্লাটিন, সিসপ্লাটিন, জেমসিটাবিন ইত্যাদি ওষুধের দাম ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

রাজধানীর পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার ওষুধ বিক্রেতারা জানান, দেশে পপুলার, ইনসেপ্টা, রেনেটা ও গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস ক্যাটামিন ইনজেকশন উৎপাদন করে। বিক্রি করে ভিন্ন ভিন্ন দামে।

গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসের জি ক্যাটামিন ৫০ এমজির প্রতিটি ভায়ালের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) ৮০ টাকা, পপুলার ফার্মার ক্যাটালার ১১৫ টাকা, ইনসেপ্টার ক্যাটারিড ১১৫ টাকা ও রেনেটার কেইন ইনজেকশন প্রতি ভায়াল ১০০ টাকা। কিন্তু সরবরাহ সংকটে বর্তমানে এসব ইনজেকশন ২০০-২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ওষুধ শিল্প সমিতি সূত্র জানায়, সাধারণত ওষুধের কাঁচামাল বা এপিআইর দাম বাড়ার কারণে বাড়ে ওষুধের দাম। পাশাপাশি বিপণন খরচের ভূমিকা থাকে। বর্তমানে বেশির ভাগ কাঁচামাল আসে ভারত ও চীন থেকে। এগুলোর দাম সময় সময় ওঠানামা করে। এক্ষেত্রে দাম বাড়লে কোম্পানিগুলো ঔষধ প্রশাসনে দাম বাড়ানোর আবেদন করে। কিন্তু দাম কমলে তারা আর ওষুধের দাম কমানোর কথা চিন্তা করে না।

এ প্রসঙ্গে ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব মো. শফিউজ্জামান বলেন, আমার জানা মতে, কোম্পানিগুলো ওষুধের দাম বাড়ায়নি। তবে দোকানিরা যদি দাম বাড়িয়ে থাকে তা দেখার দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসনের। আমাদের কিছু করার নেই।

আমাদের দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো যথেষ্ট কম দামে ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ওষুধ কেনায় ক্রেতাদের আরও সচেতন হতে হবে। ওষুধের গায়ের দাম দেখে নির্ধারিত মূল্যে ওষুধ কিনতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *