৩৫ বছর পত্রিকা বিক্রি করেও সংসারে অভাব- সংসার চালাতে হিমশিম

লতা মন্ডল-সিরাজদিখান (মুন্সিগঞ্জ) প্রতিনিধি: সকাল হলেই কাঁধে কিংবা হাতে পত্রিকার বোঝা নিয়ে বাইসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মোস্তফা। মানুষের হাতে তুলে দেন দেশ-বিদেশের খবর। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। অথচ প্রতিদিন মানুষের সুখ-দুঃখ, অভাব-অভিযোগ আর নানা সংকটের খবর বিক্রি করা এই মানুষটির নিজের জীবনেই জমেছে দুঃখের পাহাড়। সংসারের অভাব যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না তাঁর।
একসময় ছিল দিনে প্রায় ১ হাজার ২০০ কপি বিভিন্ন পত্রিকা বিক্রি করতেন মোস্তফা। সময়ের পরিবর্তনে সেই বিক্রি কমে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩০ কপিতে। পত্রিকা বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়ে স্ত্রী, দুই ছেলে, ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে সংসার চালানোই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, নিজের ও মায়ের ওষুধ, ঘরভাড়া এবং নিত্যপ্রযোজনীয় দ্রব্যের ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিসাব মেলাতে হচ্ছে তাঁকে।
মোস্তফার বসবাস মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামে। প্রায় ২০ বছর ধরে সেখানে ভাড়া থাকছেন তিনি। এর আগে সিরাজদিখান এলাকায় বসবাস করতেন। তুলনামূলক কম ভাড়ায় থাকার আশায় শহরসংলগ্ন এলাকা ছেড়ে চরাঞ্চলের কমলাপুরে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে একটি ঝুপড়ি ঘরের জন্য মাসে ভাড়া দিতে হয় ৩ হাজার ৫শত টাকা। সেই ভাড়া পরিশোধের পর পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটানো তাঁর জন্য আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পত্রিকা বিক্রি কমেছে, বেড়েছে সংসারের চাপ।
একসময় ছাপা পত্রিকার চাহিদা ছিল বেশি। পাঠকের হাতে হাতে পৌঁছে যেত দৈনিক পত্রিকা। সেই সময় দিনে প্রায় ১ হাজার ২০০ কপি পত্রিকা বিক্রি করতেন মোস্তফা। কিন্তু বর্তমানে পত্রিকার বিক্রি কমে প্রায় ২৩০ কপিতে নেমে আশায় ভালো খাবার জোটেনা বিশেষ দিনগুরোতেও। ফলে দীর্ঘদিনের এই পেশার ওপর নির্ভর করে সংসার চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। প্রতিদিনের আয় দিয়ে চাল-ডালসহ পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা, ঘরভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা এবং চিকিৎসার খরচ বহন করতে হয়। কোনো মাসে বাড়তি খরচ দেখা দিলে দেখা দেয় আরও বড় সংকট।
দুই ছেলে আলামিন মাদবর(২২) ও ইয়াছিন মাদবরের(১৪) ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটে মোস্তফার। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগানোর পাশাপাশি নিজের ও বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ কিনতে হয়। কিন্তু সীমিত আয়ে সব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময়ই তাঁকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।
ঈদ আসে, চারদিকে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে । মানুষ নতুন পোশাক কেনে, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। কিন্তু মোস্তফার কাছে ঈদের আনন্দও অনেক সময় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের সবার জন্য ভালো পোশাক কেনা তো দূরের কথা, নিত্যদিনের সংসার খরচ চালাতেই তাঁকে হিমশিম খেতে হয়।
দীর্ঘ চার দশক ধরে পত্রিকা বিক্রি করে মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দিলেও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই মোস্তফার। বয়স বাড়ছে, বাড়ছে পরিবারের দায়িত্বও। কিন্তু আয় বাড়ার পরিবর্তে কমেছে পত্রিকার বিক্রি। এই পরিস্থিতিতে কীভাবে বাকি জীবন চলবে, কীভাবে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়বেন সেই চিন্তাই তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়।
সম্প্রতি নিজের জীবনের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরতে গিয়ে মোস্তফা সাংবাদিকের কাছে আক্ষেপ করে বলেন, “আর পারা যাচ্ছে না”। তাঁর এই কথার মধ্যেই যেন ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, অসহায়ত্ব আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিত্র।
মোস্তফার জীবন কেবল একজন পত্রিকা বিক্রেতার ব্যক্তিগত সংকট নয়, এটি জীবিকার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাওয়া অসংখ্য নিম্ন আয়ের মানুষের বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। ৪৮ বছরের মোস্তফা মাদবর মানুষের হাতে প্রতিদিন খবর পৌঁছে দেওয়া এই পরিশ্রমী মানুষটির নিজের জীবনেই এখন সবচেয়ে বড় খবর সংসার চালানোর সংগ্রাম।
দীর্ঘ ৩৫ বছরের পরিশ্রমের পরও মোস্তফার জীবনে স্বস্তি ফেরেনি। প্রতিদিনের মতো আগামীকালও তাঁকে পত্রিকার বোঝা নিয়ে বের হতে হবে। কারণ তাঁর থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই, তাঁর আয়ের ওপর নির্ভর করছে স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধ মায়ের জীবনযাপন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *