ডেস্ক: ইসরায়েলের তিন বছরের দীর্ঘ যুদ্ধের পর গাজা উপত্যকায় তীব্র আবাসন সংকট দেখা দিয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ের কোনো বিকল্প না থাকায় এবং ইসরায়েল পুনর্গঠন কাজে বাধা দেওয়ায়, জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়েই ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে বসবাস করছে গাজার হাজার হাজার পরিবার।
গাজা শহরের প্যালেস্টাইন স্কয়ার এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মাসাদা আবু জারাদের কথাই ধরা যাক। তার অ্যাপার্টমেন্টের আংশিক ধসে পড়া ছাদ থেকে এখন কেবল ভাঙা কংক্রিট আর বাঁকানো লোহার রড ঝুলে আছে। ভবনের যে অংশটি ধসে উন্মুক্ত হয়ে গেছে, তার নিচেই একটি তাঁবু খাটিয়ে পরিবার নিয়ে থাকছেন তিনি। মূলত উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ার বাসিন্দা হলেও যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলি হামলায় এলাকাটি ধ্বংস হয়ে গেলে তারা বাস্তুচ্যুত হন। গত সপ্তাহে ফিলিস্তিনি বেড ক্রিসেন্ট এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী ভবনটি বিপজ্জনক ঘোষণা করে তাদের সরে যাওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে। কিন্তু বারবার স্থান পরিবর্তনের ক্লান্তি এবং নতুন কোথাও ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় মাসাদা নিরুপায় হয়ে বলেন, “আমাদের আর কোনো উপায় নেই। আমি চলে যেতে চাই, কিন্তু আমাকে বিকল্প পথ কে দেখাবে?”
প্রায় ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণ কেড়ে নেওয়া এই যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া মানুষদের আবাসন সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাস নাগাদ গাজার মোট আবাসনের ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ বা ৩ লাখ ৭১ হাজার ৮৮৮টি আবাসন ইউনিট ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগামী এক দশকে গাজা পুনর্গঠনে ৭১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত এই ভবনগুলো যে কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে গত ১৬ সেপ্টেম্বর। গাজা সিটিতে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি ছয়তলা আবাসিক ভবন ধসে ১২ জন শিশুসহ ২১ জন নিহত হন। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনায় বসবাসকারী অন্য পরিবারগুলোর মনে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।
গাজা শহরের দক্ষিণাঞ্চলীয় রেমাল এলাকার আল-নাজমা নামের একটি নড়বড়ে ছয়তলা ভবনে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানকে নিয়ে থাকেন ৪০ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আবু হাজার। উত্তর গাজার বেইত হানুন থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা আবদুল্লাহ জানান, পৌরসভার পক্ষ থেকে ভবনটির দেয়ালে ধসে পড়ার সতর্কবার্তা ঝুলিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও সেখানে ১৭টি পরিবারের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ বসবাস করছেন। ১৬ সেপ্টেম্বরের ভবন ধসের পর থেকে তিনি প্রায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। রাতে স্ত্রী ও সন্তানেরা ঘুমানোর চেষ্টা করলেও আবদুল্লাহ কান পেতে রাখেন দেয়ালের প্রতিটি অপরিচিত শব্দের দিকে। কংক্রিট নড়ে ওঠা বা পাথর সরে যাওয়ার সামান্য শব্দও তাকে আতঙ্কিত করে তোলে। তিনি বলেন, ‘আমি সারারাত জেগে পাহারা দিই, চোখ বন্ধ করতে পারি না। কিন্তু আমি জানি না এখান থেকে কোথায় যাব।”
একই ভবনের তৃতীয় তলার একটি হেলে পড়া কক্ষে পাঁচ সন্তানকে নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে বাস করছেন ৩৬ বছর বয়সী ইসলাম হাসানেইন। ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে থাকার জায়গা করে নিলেও সেখানে পানির কোনো ব্যবস্থা নেই, শৌচাগারের জন্য যেতে হয় বাইরে। প্রতিদিনই ভবনটি থেকে মটমট শব্দ ভেসে আসে এবং মাঝেমধ্যে স্তম্ভ ভেঙে পড়লে তাদের সাময়িকভাবে বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়। সামনে শীতকাল এগিয়ে আসায় ইসলামের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। কারণ, ভারী বৃষ্টি হলে উন্মুক্ত ছাদ ও দেয়াল দিয়ে পানি ঢোকার পাশাপাশি নড়বড়ে ভবনটির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। গত শীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি জানান, বিকল্প হিসেবে একটি ভালো জায়গা ও তাঁবুর ব্যবস্থা করে দিলেই তারা সকালের মধ্যে ভবনটি ছেড়ে চলে যাবেন।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, তাঁবু, ত্রিপল এবং অন্যান্য জরুরি আশ্রয় সামগ্রী প্রবেশের ওপর ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইউনিসেফের অনুমান অনুযায়ী, গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৪ শতাংশ বা ১৭ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ বর্তমানে গাদাগাদি করে বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে অথবা এমন ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাস করছেন, যেখানে ঠান্ডা, ঝড়-বৃষ্টি বা বন্যা থেকে বাঁচার কোনো সুরক্ষা নেই। সন্তানদের জীবন নিয়ে চরম আতঙ্কের মধ্যেও ইসলাম হাসানেইনের মতো হাজারো মা-বাবাকে আজ বলতে হচ্ছে, “সবাই ভয় পাচ্ছে, কিন্তু আমাদের কী করার আছে? কোনো উপায় না দেখে আমরা সবকিছু সৃষ্টিকর্তার ওপরই ছেড়ে দিয়েছি।”
সূত্র: আলজাজিরা
