মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিতে দেশের ৬৪ জেলায় অফিস স্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার। প্রত্যেক জেলায় দায়িত্ব পালন করবেন একজন সহকারী পরিচালক। আগে জেলার দায়িত্বে ছিলেন একজন ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক। প্রধান কার্যালয়ে থাকছে একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদও। থাকছে পাঁচজন পরিচালকও। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ২২৮টি পদ তৈরি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১২৬টি পদ অনুমোদন পেলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।
ওষুধবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে প্রতিনিয়ত নকল, ভেজাল, নিম্নমান, মেয়াদোত্তীর্ণ ও আনরেজিস্টার্ড ওষুধ বিক্রি নিষিদ্ধ হচ্ছে। দেশের প্রতিটি জেলায় এসব অনিয়ম প্রতিরোধে ওষুধ প্রশাসনের লোকবলের ঘাটতি রয়েছে। তদারকির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা অনিয়মের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন। এসব অনিয়ম প্রতিরোধে সরকার দেশের প্রতিটি জেলায় ওষুধ প্রশাসনের অফিস স্থাপন করতে যাচ্ছে। বাড়ানো হয়েছে লোকবলের পরিধি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওষুধের মান নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু আগে ওষুধ প্রশাসনে লোকবল ছিল খুবই সীমিত। সেখানে একজন পরিচালক দায়িত্ব পালন করতেন। মতিঝিলে একটি তলায় অফিস থাকলেও সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীর বসার স্থান ছিল সীমিত আকারে। ২০১০ সালে সরকার অধিদপ্তরে রূপান্তর করে। পরে অফিসের নিজস্ব জমি ও ভবন হয় মহাখালীতে। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে আট তলা ভবন। যদিও নির্মাণকাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। আস্তে আস্তে বাড়ানো হচ্ছে লোকবল।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত মহাপরিচালক মূলত প্রশাসন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ফিন্যান্স ও আইটি, পলিসি, আইন, কিউএ, এরমআইএস, ইম্পোর্ট ও পরিসংখ্যান উইংয়ের দায়িত্ব পালন করবেন। খসড়া নিয়োগবিধি তৈরির কাজ চলছে। তবে অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদে পদোন্নতি পেতে হলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে পরিচালক পদে এক বছর, উপপরিচালক পদে পাঁচ বছর ও ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক পদে ২০ বছর কর্মরত থাকতে হবে। পাঁচজন পরিচালকের মধ্যে রয়েছে পরিচালক (অর্থ ও বাজেট), পরিচালক (লাইসেন্সিং অ্যান্ড ইন্সপেকশন অব ফার্মাসিউটিক্যালস, ভ্যাকসিন অ্যান্ড বায়োলজিক বিভাগ), পরিচালক (লাইসেন্সিং অ্যান্ড ইন্সপেকশন অব সি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও মেডিকেল ডিভাইস), পরিচালক (সব ল্যাবরেটরি)।
জেলা পর্যায়ের অফিসে থাকছে একজন সহকারী পরিচালক, ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক, ওষুধ পরিদর্শক ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক। ইতোপূর্বে দেশের ৪৮ জেলায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অফিস থাকলেও সেখানে দায়িত্ব পালন করতেন একজন ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক, একজন অফিস সহকারী ও একজন পিয়ন ছিল। তবে নতুন জেলা অফিসগুলোতে সহকারী পরিচালক প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া দেশের প্রতিটি বিনমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরে অফিস স্থাপন করা হচ্ছে। এসব অফিসের দায়িত্বে থাকবেন একজন ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক। ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও মোংলা সমুদ্রবন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দরে এসব অফিস থাকবে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আগে যেসব জেলায় অফিস ছিল না সেগুলো হচ্ছে, জয়পুরহাট, শেরপুর, বান্দরবান, লক্ষ্মীপুর, শরিয়তপুর, মুন্সীগঞ্জ, রাজবাড়ি, খাগড়াছড়ি, নড়াইল, মেহেরপুর, বরগুনা, ঝালকাঠি, হবিগঞ্জ, মাগুরা, গাইবান্দা ও পঞ্চগড়। এসব জেলার দায়িত্বে একজন ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। কোথাও তিন জেলা মিলে একজন ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। ফলে কোথাও নকল ভেজাল ওষুধ উৎপাদন কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ, আনরেজিস্টার্ড, ভেজাল, ফিসিসিয়ান স্যাম্পল বিক্রি হলেও একজন ড্রাগ সুপারের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না।
বিশিষ্ট ওষুধবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুসদের সাবেক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন, বিতরণ, বিক্রি ও সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ হচ্ছে কিনা, সেটি দেখার দায়িত্ব ওষুধ প্রশাসনের। কিন্তু তাদের লোকবল ছিল খুবই সীমিত। দেশের ৩৭ জেলায় সামান্য একটি অফিস ছিল। সেখানে লোকবল ছিল না। তবে সব জেলায় অফিস স্থাপন খুবই ভালো এশটি উদ্যোগ। এই উদ্যোগ সফল করতে দরকার গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট। যদিও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে ফার্মাসিস্ট তেমন নেই। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে এখন ওষুধ প্রশাসনে দরকার সবগুলো পদে যাতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ হয়।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন, আগে জেলার দায়িত্ব পালন করতেন একজন ড্রাগ সুপার। তা-ও অনেক জেলায় ছিল না। বর্তমানে জেলার দায়িত্ব পালন করবেন একজন সহকারী পরিচালক। সোমবার ৪৪ জন ড্রাগ সুপার পদোন্নতি পেয়েছেন। তারা সহকারী পরিচালক হিসেবে মঙ্গলবার জেলার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অবশিষ্ট জেলায় পদোন্নতির মাধ্যমে পদ পূরণ করা হবে। আর যেসব ড্রাগ সুপার পদোন্নতি পেয়েছে সেসব খালি পদে নতুন লোক নিয়োগ দেওয়া হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
মহাপরিচালক আরও বলেন, জনস্বাস্থ্য রক্ষা করাই অধিদপ্তরের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে নকল-ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ, মানহীন ওষুধ যাতে কেউ বিক্রি করতে না পারে সেজন্য লোকবল বৃদ্ধির বিকল্প নেই। প্রতিটি জেলায় অফিস স্থাপন সম্পন্ন হলে লোকজনকে মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে জানান তিনি।
