মব ভা’য়ো’লেন্স যেন ধ্বং’সের বাংলাদেশ

বীর মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহীম খলিল সবুজ : তখনও শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলন চলছিল এবং পুলিশ আন্দোলনকারীদের পরাস্ত করতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছিল। দুটি মিছিল জড়ো হয়েছিল এনায়েতপুর থানার সামনে। থানায় ছিল তখন ৪০ জন পুলিশকর্মী। দু’পক্ষের প্রচণ্ড শক্তি প্রদর্শনের এক পর্যায়ে পুলিশ প্রাণ বাঁচাতে আত্মসমর্পনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে থানার ভেতরে তাণ্ডবলীলা চালায়। পুলিশ সদস্যরা তখন যে-যেভাবে পারে পালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু ১৪ জন পুলিশসদস্য ধরা পড়ে যায় আন্দোলনকারীদের হাতে। এই ১৪ জন পুলিশসদস্যকেই আন্দোলনকারীরা গণপিটুনিতে অর্থাৎ মব ভায়োলেন্সে হত্যা করে নির্মমভাবে। সেই শুরু জুলাই-আগস্টের মব ভায়োলেন্স। ততক্ষণে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতের পথে। দেশজুড়ে তখন আক্রান্ত সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান। আক্রান্ত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বাড়ি-ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান; আক্রান্ত আহমদিয়াদের উপাসনালয়ও। আক্রান্ত ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ পাকিস্তানের আত্মসমর্পনের ভাস্কর্য; রাজধানী ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান সংক্রান্ত ‘দীপ্ত শপথ’ স্মারক; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুর‌্যালসহ বেশ কিছু মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক। এসব শুনে ভয়ে পালাতে গেলেন চাঁদপুরের সেলিম খান ও তার ছেলে চিত্রনায়ক শান্ত খান। সেলিম খানের পরিচালনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র ‘টুঙ্গিপাড়ার মিয়া ভাই’-তে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করেছিল শান্ত। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না তাদের। পার্শ্ববর্তী বাগাড়া বাজারে মারমুখী মব ভায়োলেন্সে প্রাণ হারায় বাবা-ছেলে দু’জনেই।

খবর রটে গেল- বিচারব্যবস্থায় ক্যু হতে পারে। আন্দোলনকারী ছাত্ররা রাস্তায় নেমে এল; সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও হয়ে গেল। চাপের মুখে সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ আপীল বিভাগের বিচারপতিদের পদত্যাগ হয়ে গেল। তারপর আর মব ভায়োলেন্সের গতি থামানো যায়নি। মব ভায়োলেন্সে সম্পন্ন হয়েছে বড় বড় বদলি, পদত্যাগ; তৈরি হয়েছে নতুন নতুন আইন; বদলে গেছে রাষ্ট্রীয় নীতি-নিয়ম। জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা থেকে বাদ পড়েনি কলেজ-স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ব্যক্তি ও শিক্ষক-শিক্ষিকা; বাদ পড়েনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর ও ডেপুটি গভর্ণররাও। মব ভায়োলেন্সের শিকার হতে বাদ পড়েনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চোর সন্দেহের ভারসাম্যহীন তফাজুল হোসেন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ করার অপরাধে শামীম আহমেদ। মব ভায়োলেন্স ঠিক করে দিয়েছে- নারী কেমন পোশাক পরবে, কীভাবে পরবে। মব ভায়োলেন্সে আদালত পাড়ায় নিগৃহীত হয়েছে একের পর এক আসামী। জুতা মারা, ডিম নিক্ষেপ এসব থেকে মুক্ত থেকেছে- এমন আসামী খুঁজে পাওয়া কঠিন জুলাই-আগস্টের পরের আদালত পাড়ায়। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মামলার রায়ে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করায় হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালকে লক্ষ্য করে ডিম ছুঁড়ে একদল আইনজীবী। ঘটনার তীব্রতায় বেঞ্চের দুই বিচারকই দ্রুত এজলাস ত্যাগে বাধ্য হন।

মব ভায়োলেন্সের সর্বশেষ শিকার হলেন সাবেক সিইসি কে এম নুরুল হুদা। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তৎকালীন সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, ২০১৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন সিইসি কে এম নুরুল হুদা এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের তৎকালীন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালকে আসামী করে মামলা করে বিএনপি। তারপরই সাবেক সিইসি নুরুল হুদার বাসায় মব তৈরি করে একদল লোক। তারা নুরুল হুদাকে একটি জুতার মালা পরিয়ে দেয়। এক ব্যক্তি তার গালে জুতা দিয়ে মারতে থাকে। কেউ কেউ নুরুল হুদাকে ডিম ছুঁড়ে মারে। ভিডিও করে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং সারা দেশের মানুষ এই মব ভায়োলেন্সের দৃশ্য দেখতে পায়। হেনস্তার এক পর্যায়ে লোকগুলো তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশের উপস্থিতিতেও তাকে নানাভাবে অপদস্থ করার দৃশ্য দেখা যায়। পাথর ছুরে ব্যবসায়িক খুন, ধর্ষণের দেশ জুরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরছে। এ যেন এক হলি খেলার দেশে মব পরিণত হয়েছে। এমন হিংসাত্মক পরিবেশ ও পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে?

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’-র (এইচআরএসএস) হিসাব অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম সাত মাসে মব ভায়োলেন্সের ১১৪টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ১১৯ জন নিহত এবং ৭৪ জন আহত হয়েছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’-এর (আসক) এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, এপ্রিল পর্যন্ত মব ভায়োলেন্সে নিহত হয়েছে ১৬১ জন। আসক-এর তথ্যমতে, ছাত্র আন্দোলনের মাস আগস্টেই মব ভায়োলেন্সে নিহত হয় ২১ জন; এছাড়াও সেপ্টেম্বরে ২৮, অক্টোবরে ১৯, নভেম্বরে ১৪, ডিসেম্বরে ১৪, জানুয়ারিতে ১৫, ফেব্রুয়ারিতে ১১, মার্চে ১০ এবং এপ্রিলে ১৮ জন মব ভায়োলেন্সে নিহত হয়।

মব ভায়োলেন্সের দৌরাত্ম আর কতদূর- এ প্রশ্ন এখন বাংলাদেশের মানুষের মনে ঘুরছে। ভয়ে আছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তি থেকে শুরু করে অফিসের পিয়ন পর্যন্ত- কে-কখন পড়ে যায় মব ভায়োলেন্সের হাতে! একজন সাবেক সাংবিধানিক সর্বোচ্চ কর্মকর্তা নুরুল হুদার ওপর ভায়োলেন্স দেখে স্তম্ভিত হয়েছে পুরো জাতি। ৭৭ বছর বয়সী একজন সাবেক সচিব, একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদাকে মাত্র কয়েকজন ব্যক্তি জোর করে জুতার মালা পরিয়ে দিয়ে, জুতার আঘাত করে, ডিম ছুঁড়ে অপমান করে এবং ভিডিও করে তা প্রচার করলে প্রশ্ন জাগে মনে- এই মানুষটি কোথায় বসবাস করছেন? একটি দেশে, না কোনো জঙ্গলে? দেশে থাকলে তো সেই দেশে একটি সরকার, একজন সরকারপ্রধান, একজন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, সেনাবাহিনী এসব থাকার কথা! ঘুমন্ত নয়, জেগেই থাকার কথা! দেশে না হয়ে তিনি যদি জঙ্গলে বাস করেন, তাহলে সেখানে নীতি থাকবার কথা নয়, নিয়ম থাকবার কথা নয়- বাঘ-ভালুক যে যার শক্তি দিয়ে যা কিছু করতে পারে। তিনি অভিযুক্ত ছিলেন- বিচার হতে পারে! দোষী হলে শাস্তিও পাবেন! কিন্তু শুধু অভিযোগ তুলেই শাস্তি, জুতার মালা? তা-ও আবার পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে? জাতি চোখ বড় বড় করে দেখছে? আইন-আদালত, রাষ্ট্র সবাই দেখছে? সরকারপ্রধান শান্তিতে নোবেল জয়ী অধ্যাপক ইউনূস দেখছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ভাবছেন, মব ভায়োলেন্স অনেকটাই কমে এসেছে। তারপরও তাদের পদ থাকছে; প্রধান উপদেষ্টার চেয়ার শক্ত করার জন্য বিদেশে গিয়ে দেশিশক্তির সঙ্গে সমঝোতা বৈঠক করছেন! সবই হচ্ছে শান্তির নামে। যেমন শান্তিতে নোবেল পাওয়ার জন্য আশাবাদ করছেন- পৃথিবীতে শান্তির যুদ্ধ লাগানো ডোনাল্ড ট্রাম্প। নুরুল হুদার মতো মানুষদের জুতা মেরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে আমাদের প্রধান উপদেষ্টা আর একবার শান্তির নোবেল পুরষ্কার পেয়েও যেতে পারেন!

লেখবক:  সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলাম লেখক গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *