লেখকঃ ইয়াসিন মুনিফ:
দোহারের সড়কগুলি আজও যেন এক মহাকাব্যের স্তবক, যেখানে ছড়িয়ে রয়েছে মানুষের জীবনের নানা গল্প। কিন্তু এই গল্পগুলোর মাঝে ভীষণ দুঃখের একটি অধ্যায় হলো বাইক দুর্ঘটনা, যা এখানে নতুন নয়, বরং বহুদিনের পরিচিত বেদনাদায়ক সত্য।
প্রতিদিন আমরা দেখি, দোহারের রাস্তায় ছুটে চলা তরুণেরা যেন নিজেরাই নিজের জীবনের বিপদ ডেকে আনছেন, আর পেছনে থেকে কান্না আর হতাশার অশ্রু। কেন এমন ঘটে? কারণগুলো আমাদের চারপাশেই,কিন্তু তা মানতে হয় অনেকেরই না।
পিতামাতার অবিবেচকতা: অল্প বয়সে বাইকের উপহার
দোহারের বাসিন্দারা জানেন, অনেক পিতা-মাতা অল্প বয়সী সন্তানদের হাতে বাইক তুলে দিয়ে চিন্তা করেন না এর ঝুঁকি নিয়ে। “বাবা, আমি সামলাতে পারব,” এই বিশ্বাসে তারা সন্তানদের রাস্তায় নামায়। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন,অপরিপক্ক মন এবং অভিজ্ঞতার অভাবে দুর্ঘটনার পথ প্রশস্ত হয়। ছোটবেলা থেকেই বাইকের কন্ট্রোল যাদের নেই, তারা দুর্ঘটনার শিকার হওয়া ছাড়া উপায় পায় না।
অপরিকল্পিত ট্রাফিক শিক্ষা এবং সচেতনতার অভাব
দোহারের তরুণদের অনেকেই কখনো সঠিক ট্রাফিক শিক্ষা পায়নি। বাইক চালানো শেখা হয় প্রায়ই পার্টনার বা বন্ধুদের কাছ থেকে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা না রেখে। হেলমেট ব্যবহারের গুরুত্ব বোঝা যায় না, সিগন্যাল মেনে চলার কথা প্রায় কেউ ভাবেই না। এর ফলে সড়কের নিয়মগুলো বর্জিত হয়, এবং দুর্ঘটনা ঘটে।
সড়ক অবকাঠামোর দুরবস্থা
সড়কের গর্ত, অপর্যাপ্ত আলো ও অনিয়মিত রাস্তা দোহারের এক বাস্তব চিত্র। কোথাও ড্রেনেজ না থাকায় জল জমে থাকে, যেটা বাইকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বড় কারণ। এরকম অবস্থা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দোহারের জনসাধারণ চাই সড়কের উন্নয়ন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ যাতে দুর্ঘটনা কমানো যায়।
ট্রাফিক আইন অমান্য: ‘আমি করব, তুমি করো না’ মনোভাব
দোহারে অনেকেই ট্রাফিক আইন মানতে চান না। উল্টো দিকে চালানো, মোড় নেয়ার সময় ইন্ডিকেটর না দেওয়া, অতি দ্রুত গতিতে বাইক চালানো,এসব অভ্যাস দুর্ঘটনার মূল কারণ। একের পর এক দুর্ঘটনা দেখে যেমন স্থানীয় প্রশাসন সতর্ক হতে পারে, তেমনি নাগরিকদেরও তাদের দায়িত্ব বুঝতে হবে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
দোহারের প্রতিটি বাইক দুর্ঘটনা কেবল ব্যক্তির জীবনই নয়, পুরো পরিবারের জীবনে অন্ধকার ফেলে। চিকিৎসা ব্যয়, আয় হারানো, মানসিক যন্ত্রণা,এসব কষ্ট একটির পর একটি বাড়তে থাকে। সমাজও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়, কারণ সড়ক দুর্ঘটনা কমিউনিটির স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
প্রতিকার ও প্রত্যাশা
দোহারের বাইক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে,পিতা-মাতা থেকে শুরু করে প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ। সঠিক ট্রাফিক শিক্ষা দিতে হবে, হেলমেট ব্যবহারের ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, সড়ক অবকাঠামো উন্নত করতে হবে, আর আইন প্রয়োগকে কঠোর করতে হবে।
দোহারের রাস্তাগুলো যেন শুধু জীবনের গন্তব্যের পথ হয়, মৃত্যু নয়। তরুণেরা যেন জীবন ধরে রাখতে শিখে, নিজের ও অন্যের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে পারে।
এই শুধু একটি প্রতিবেদন নয়, এটি দোহারের মানুষের প্রতি একটি আহ্বান,আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সমস্যা দূর করা কঠিন। কারণ, জীবন সবচেয়ে বড় সম্পদ, আর দোহারের প্রতিটি জীবনই আমাদের প্রিয়।
