দীর্ঘ কারাভোগ শেষে দেশে ফিরলেন ৯১ বাংলাদেশি জেলে, মোংলায় স্বজনদের সাথে পুনর্মিলন

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাটঃ  ‎ভারতীয় জলসীমায় অনুপ্রবেশের দায়ে আটক ৯১ জন বাংলাদেশি জেলেকে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক তৎপরতার পর নিজ দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে কোস্ট গার্ড।

‎দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি থাকা ৯১ জন বাংলাদেশি জেলে অবশেষে মুক্তি পেয়ে নিজ দেশে ফিরেছেন। গত সোমবার দুপুরে বাগেরহাটের মোংলায় অবস্থিত কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন সদর দপ্তরে এক আবেগঘন পরিবেশে এই জেলেদের তাদের অপেক্ষমাণ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে, গত রোববার বাংলাদেশ-ভারত আন্তর্জাতিক মেরিটাইম বাউন্ডারি লাইনে (আইএমবিএল) ভারতীয় কোস্ট গার্ড চারটি ফিশিং ট্রলারসহ এই জেলেদের আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করে। মূলত গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বঙ্গোপসাগরের ভারতীয় জলসীমায় মাছ ধরার সময় অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাদের আটক করেছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। দীর্ঘ সময় কারাভোগের পর কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের মুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

‎ভুক্তভোগী জেলেদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সমুদ্রে মাছ ধরার সময় অনেক ক্ষেত্রে দিকনির্ণয় যন্ত্রের ত্রুটি বা স্রোতের টানে তারা অজান্তেই আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে ফেলেন, যার চরম মাসুল দিতে হয় তাদের। মুক্তি পাওয়া জেলেদের স্বজনরা জানান, উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি দীর্ঘ সময় জেলে থাকায় পরিবারগুলো চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছিল। মোংলায় ফিরে আসা জেলেরা জানিয়েছেন, ভারতীয় কারাগারে তাদের দীর্ঘ সময় বন্দি থাকতে হয়েছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ট্রলারসহ তাদের ফিরিয়ে আনা হলেও দীর্ঘদিনের এই অনুপস্থিতি জেলে পরিবারগুলোর জীবিকায় বড় ধরনের ধস নামিয়েছে। সমুদ্রসীমা নিয়ে সুনির্দিষ্ট ধারণার অভাব এবং ট্রলারের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অনেক সময় সাধারণ জেলেরা এই রুট ডাইনামিক্সে আটকা পড়েন, যা তাদের জন্য নিয়মিত আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‎কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং ভারত ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পারস্পরিক ফলপ্রসূ সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই ৯১ জন জেলের মুক্তি ত্বরান্বিত হয়েছে। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, আটক জেলেদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ছিল, তবে দুই দেশের জলসীমা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতার ফলে এটি সম্ভব হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, বারবার সমুদ্রসীমা লঙ্ঘনের এই প্রবণতা রোধে জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ট্রলারে আধুনিক নেভিগেশনাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলেদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের ট্রলারসহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে পুনর্বাসনের পথ প্রশস্ত করা হয়েছে।

‎৯১ জন জেলের এই প্রত্যাবর্তন মূলত সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে সম্প্রদায়ের জন্য স্বস্তির বার্তা বয়ে আনলেও, এটি ভবিষ্যতে সীমানা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে নতুন করে ভাবনার খোরাক দিচ্ছে। বারবার বাংলাদেশি জেলেদের ভারতীয় জলসীমায় আটকের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সমুদ্রসীমা নির্ধারণ ও সচেতনতামূলক প্রচারণায় এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, জেলেদের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত জটিলতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সমুদ্রগামী ট্রলারগুলোর নিয়মিত নজরদারি ও প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। এই ৯১ জন জেলের ফিরে আসা শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়ার সফলতাই নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে সমুদ্র নিরাপত্তায় পারস্পরিক সহযোগিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *