কাঁদলে মানুষ বেশি দিন বাঁচে!

দুঃখ-কষ্টে চোখ দিয়ে পানি ঝরানোর নাম কান্না। জন্মের পর মানব শিশু প্রথম যে কাজটি করে তা হচ্ছে কান্না। কান্না দিয়েই শুরু হয় মানব জীবনের সূচনা। আমরা দুঃখ পেয়ে, আঘাত পেয়ে কিংবা প্রচণ্ড খুশিতে আটখানা হয়ে নীরবে কিংবা সরবে চোখ দিয়ে পানি ফেলি। কিন্তু কেন এটা হয়? কান্নার জটিল রহস্য বিজ্ঞানীদের কাছে এতদিন ছিল অজানা। কান্নার অশ্রুধারা কীভাবে কোথা হতে বৃষ্টির মতো ঝরে এ নিয়ে গবেষণার শেষ নেই।

কান্নার রসায়ন

কান্না সম্পর্কে বিজ্ঞান এখন যুতসই ব্যাখ্যা দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মানুষের মধ্যে দুঃখ, কষ্ট, ব্যথা, আবেগ, মানসিক চাপ, মান-অপমান ইত্যাদি অনেক কারণে মানুষ কাঁদে। দুঃখ পেলে ৪৯ শতাংশ, সুখের ক্ষেত্রে ২১ শতাংশ, রাগের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ নারী অঝোরে কাঁদেন। চার্লস ডিকেন্স অবশ্য বলেছেন অন্য কথা। ‘কান্না শরীরের ভেতরটা পরিষ্কার করে দেয়। চোখের আবর্জনা পরিষ্কার করে এবং চোখকে নরম রাখে। চোখের ব্যায়াম হয়। অতএব কেঁদে যাও জনম ভর।’

কান্নার কাজ

গবেষকরা ব্যাখ্যা করে বলেন, আমাদের চোখের পাতা হলো একটা ভাঁজ পড়া চামড়া। যা কতগুলো পেশির টানে স্টেজের পর্দার মতো ওঠানামা করে। তবে এই ওঠানামা কাজটা এত দ্রুত ঘটে যে, আমাদের দেখতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না। আর এটিকে বলে পলক পড়া। প্রতি ছয় সেকেন্ড অন্তর আমাদের চোখের পলক পড়ে। সুস্থ-সবল মানুষের চোখের পাতা ওঠানামা করে প্রতি মিনিটে ১৬ বার। আমাদের চোখের বাইরের দিকের কোণে একটি অশ্রুগ্রন্থি রয়েছে। আরও রয়েছে কিছু নল। যা অশ্রুজলকে চোখের পাতায় নিয়ে যায়। কিছু নল অশ্রুজলকে চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। মনে রাখা দরকার, আমাদের চোখে যতবারই চোখের পলক পড়ে ততবারই অশ্রুগ্রন্থি থেকে খানিকটা অশ্রু বেরিয়ে আসে। এর কাজ হলো কর্নিয়াকে ভিজিয়ে রাখা। যাতে শুকিয়ে না যায়। অশ্রুর সঙ্গে বেরিয়ে যায় দূষিত পদার্থও।

কান্নার জন্ম উৎস

একসময় বিজ্ঞানীরা শুধু ধারণা করতেন, মানুষ কাঁদে, কারণ এ অশ্রু চোখের ময়লা পরিষ্কার করে। চোখকে ময়লাজনিত ক্ষতি হতে রক্ষা করার জন্য কান্না করেন মানুষ। এবার এ কান্না নিয়ে বিজ্ঞানীরা নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অশ্রু নির্গত হয় চোখের তিনটি স্তর দিয়ে। চোখের উপরিভাগে রয়েছে এই তিনটি স্তর। সবচেয়ে নিচের স্তরের নাম মিউকয়েড স্তর। চোখের ভেতরে যে কোষ রয়েছে সেখানে জন্ম হয় অশ্রুকণার। মিউকয়েড স্তর অশ্রুকণাকে চোখের কর্নিয়ার ওপর ছড়িয়ে দেয়। চোখের উপরিভাগে রয়েছে ল্যাকরিমাল গ্রন্থি। এ গ্রন্থি থেকে চোখের জলীয় স্তরটি আমরা অনুভব করি। চোখকে ভেজা ও মসৃণ রাখাটাই এর কাজ। চোখের পাতার প্রান্তদেশে অর্থাৎ সবচেয়ে বাইরের যে তৈলাক্ত স্তর এটি নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষুদ্র গ্রন্থি, যা থেকে নিঃসরণ হয়ে এটি তৈলাক্ত হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এভাবেই কান্না নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।

কেন মানুষ কাঁদে?

কেন মানুষ আবেগজনিত কারণে কাঁদে? এ প্রশ্ন আপনার-আমার মতো অনেকের মধ্যে বারবার ঘুরে ফিরে আসে। প্রাণরসায়ন বিজ্ঞানী উইলিয়াম ফ্রে ১৯৭২ সালে ছাত্রাবস্থায় সর্বপ্রথম কান্নার ওপর গবেষণা শুরু করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি সর্বপ্রথম উল্লেখ করেন, অশ্রুকে সাধারণ পানির মতো মনে হলেও তা সঠিক পানি নয়। যন্ত্রণা, আবেগ বা দুঃখ-কষ্টের যে অশ্রু নির্গত হয়, তাতে সাধারণ অশ্রুর চেয়ে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি থাকে। গবেষকদের প্রশ্ন, তবে হাসিতে কেন কান্না ঝরে? বিজ্ঞানীরা উত্তরে জানান, অতিরিক্ত হাসলে মুখের পেশিগুলো অশ্রুগ্রন্থিতে চাপ দেয়। ফলে অশ্রু নিঃসরণ ঘটে। আসলে এর সঙ্গে কান্নাকাটির সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে নেই বলে মনে হলেও কান্নার সময় একই ঘটনা ঘটে। দুটোই অশ্রুপাত। পার্থক্য শুধু পরিমাণে। কেউ যখন অঝোর ধারায় কাঁদে তখন ব্যাপারটি হয় আলাদা। দুঃখ পেলে আমাদের আবেগ অন্যভাবে প্রকাশ করতে না পারলে আমাদের দেহ ইচ্ছার বিরুদ্ধে কান্নার মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এ কান্নার সঙ্গে সক্রিয় হয়ে উঠে ল্যাকরিম্যাল গ্রন্থি। কান্না তখন বাঁধ ভাঙা স্রোতের মতো চোখ দিয়ে চিবুক গড়িয়ে, কিছু কিছু নাক দিয়েও নির্গত হয়।

মেয়েরা বেশি কেন কাঁদে?

মানুষ গড়ে কতবার কাঁদে? কী কারণে কাঁদে? কাঁদার পর কেমন বোধ করে? ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর নির্ণয়ের জন্য ফ্রে একটি গবেষণা চালান। আঠারো থেকে পঁচাত্তর বছর বয়স পর্যন্ত এমন ৩৩০ জনকে কান্নার ওপর বিস্তারিত লিখতে বলেন। তাতে দেখা যায়, এক মাস বা ত্রিশ দিনে পুরুষের গড় কান্না ১ দশমিক ১৪ বার। আর মহিলাদের ৫ দশমিক ৩ বার। কাঁদার পরে ভালো বোধ করে এমন মহিলার সংখ্যা ৮৫ শতাংশ। এক্ষেত্রে পুরুষের সংখ্যা ৭৩ শতাংশ। সুস্থ মহিলার মধ্যে ৬ শতাংশ এবং সুস্থ পুরুষের মধ্যে ৪৬ শতাংশ ত্রিশ দিনে একবারও কাঁদেনি। এ গবেষণায়, খুশিতে গড়িয়ে পড়া অশ্রু থেকে কষ্টের অশ্রুও রয়েছে। পুরুষ মানুষ ফেসবুক, ইউটিউব, টিভি বা সিনেমার দুঃখজনক কিছু মন দিয়ে দেখলে অনেকেই কাঁদে। একইভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেও অনেক সময় কাঁদে পুরুষ। আর মেয়েদের কান্নার প্রধান কারণও ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং প্রিয়জন থেকে বিচ্ছেদ। মেয়েদের কান্নার বেশিরভাগ আবেগনির্ভর। দুঃখ পেলে ৪৯ শতাংশ, সুখের ক্ষেত্রে ২১ শতাংশ, রাগের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ নারী অঝোরে কাঁদেন। কিন্তু কোনো পুরুষ কখনই রাগের কারণে কাঁদে না। এমনটি বলেছেন বিজ্ঞানী ফ্রে।

মেয়েদের কান্না গবেষণা

বিজ্ঞানীদের ধারণা, শরীর ও মনের জন্য কান্না সত্যিই উপকারী। কান্না একটি স্বাভাবিক দৈহিক প্রক্রিয়া। আর তাই বিভিন্ন আবেগের প্রেক্ষিতে কাঁদতে লজ্জার কিছু নেই। আর এ অশ্রু বিসর্জনের ফলে রেহাই মেলে অনেক রোগ থেকে। কিন্তু কেন মেয়েরা বেশি কাঁদে? মহিলাদের পুরুষের তুলনায় বেশি কান্না সম্পর্কে বিজ্ঞানী ফ্রে যা উল্লেখ করেছেন তা হলো- বাচ্চা অবস্থায় ছেলে ও মেয়ে উভয়ের কান্নার প্যাটার্ন একই রকম। কিন্ত বয়ঃসন্ধির পর তা আলাদা হয়ে যায়। প্রোলেকটিন নামে একটি হরমোন বারো বছরের আগে ছেলে ও মেয়েদের দেহে সমপরিমাণ থাকে। কিন্তু বারো থেকে আঠেরো বছর বয়সে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের দেহে এর পরিমাণ ষাট ভাগ বেড়ে যায়। এ হরমোনের সঙ্গে মেয়েদের বুকের দুধ উৎপাদনের বিষয়টি জড়িত থাকলেও ফ্রে’র মতে এটির সঙ্গে কান্নার সম্পর্কও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

পুরুষ মানুষকে কাঁদতে নেই

সমাজে প্রচলিত রয়েছে, পুরুষ মানুষকে কাঁদতে নেই। তাই বয়স্ক পুরুষ তো দূরের কথা!
আট-দশ বছরের কোনো ছেলেও যদি কাঁদে তখন এমন প্রশ্ন করেন সবাই- ‘আহারে! এত বড় ছেলে! আবার কাঁদে?’ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এমন ধরনের মন্তব্য পুরুষদের কান্না কমিয়ে দিয়েছে। গবেষকদের মতে, এতে করে অব্যক্ত ব্যথা, চাপা বঞ্চনা বেরুতে পারে না। মানসিক চাপ তৈরি করে। যা মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ডের সুস্থতার জন্য ক্ষতিকর। পুরুষরা দুঃখ, কষ্ট, ব্যথা ভুলতে পরবর্তীতে নেশা বা অন্য কোনোভাবে ওই দুশ্চিন্তা চেপে রাখার চেষ্টা করে। যা সুস্বাস্থ্যের জন্য আরও ক্ষতিকর।

প্রাণরসায়ন বিজ্ঞানী উইলিয়াম ফ্রে জানান, ‘মানসিক দুশ্চিন্তা, চাপ বা নানা কারণে মেয়েরা ছিচকাঁদুনে হয়। সহজে কেঁদে ফেলেন। অব্যক্ত ব্যথা, চাপা বঞ্চনা কান্নার মাধ্যমে নির্গত করে স্বাস্থ্যগতভাবে অনেক ভালো থাকেন। সমাজে মেয়েদের কান্না দোষের কিছু নয়। কান্নার কারণেই পুরুষের তুলনায় মেয়েদের মানসিক দুশ্চিন্তাজনিত রোগ কম হয়। এ জন্যই পুরুষের তুলনায় বেশিদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে সক্ষম হয় মেয়েরা।’

লেখক : শেখ আনোয়ার

বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *