খেজুর ও তালের বিকল্প গোলপাতার গুড়: উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি

‎ম. ম. রবি ডাকুয়া: ‎সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চলে জন্মানো গোলপাতার রস ও গুড় বাণিজ্যিকভাবে খেজুর ও তালের গুড়ের বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পাশাপাশি পুষ্টির নতুন উৎস হতে পারে।

‎‎বাংলাদেশের উপকূলীয় ও সুন্দরবন সংলগ্ন লবণাক্ত অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গোলপাতা বা নিপা পাম এখন কেবল গৃহস্থালির ছাউনি হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক আয়ের নতুন উৎস হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গোলগাছের ডাণ্ডি থেকে সংগৃহীত রস জ্বালিয়ে তৈরি করা গুড় স্বাদ ও গুণগত মানে খেজুর বা আখের গুড়ের সমতুল্য। বাগেরহাটের মংলা উপজেলার মিঠাখালী ইউনিয়নের খোনকারবেড় গ্রামে বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইন্সটিটিউটের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি সফল প্রকল্পের মাধ্যমে এই সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে এসেছে। পৌষ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত প্রথাগত পদ্ধতিতে গোলগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে তা থেকে গুড় তৈরির এই প্রক্রিয়া উপকূলীয় কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক শিল্প হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত কাঁচামাল অত্যন্ত সহজলভ্য এবং চাষাবাদে কোনো প্রকার রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না, যা একে একটি পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ তৈরি করেছে।

‎স্থানীয় পর্যায়ে গোলফলের শাঁস জনপ্রিয় হলেও এর রস থেকে গুড় তৈরির পদ্ধতিটি এখনো অধিকাংশ মানুষের কাছে অজানা। অভিজ্ঞ সংগ্রাহকদের মতে, গোলগাছের ডাণ্ডি কৌশলে ছেঁটে রস সংগ্রহ করা হয়, যা পরে জ্বাল দিয়ে ঘন গুড়ে পরিণত করা হয়। এই গুড় স্বাদে কিছুটা নোনতা হওয়ায় শরীরের লবণের ঘাটতি পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে গবেষকরা মত দিয়েছেন। স্থানীয়রা জানান, সঠিক প্রশিক্ষণ ও প্রচারণার অভাবে এই খাতটি এখনো কুটির শিল্পের সীমাবদ্ধ গণ্ডি পেরোতে পারেনি। অথচ পতিত জমি, খালের পাড় বা নিচু জলাভূমিতে পরিকল্পিতভাবে গোলগাছ চাষ করলে তা থেকে বিপুল পরিমাণ গুড় উৎপাদন সম্ভব। বর্তমানে যারা পরীক্ষামূলকভাবে এটি করছেন, তারা বাজারজাতকরণে কিছুটা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলেও এর চাহিদার ব্যাপকতা সম্পর্কে আশাবাদী। বিশেষ করে পিঠা, পুলি ও পায়েসসহ বিভিন্ন মুখরোচক খাদ্য তৈরিতে এই গুড় ব্যবহারের অবারিত সুযোগ রয়েছে, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য জেলায় বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

‎সংশ্লিষ্ট কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকরা মনে করছেন, গোলপাতার গুড়কে মূলধারার বাজারে জনপ্রিয় করতে হলে সরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার ও কারিগরি প্রশিক্ষণ জরুরি। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় গোলগাছের বাগান বা গোলবহর গড়ে তোলা অত্যন্ত সহজ এবং সাশ্রয়ী, কারণ গাবনা বা গোলফল মাটিতে পুঁতে দিলেই চারা জন্মায়। কোনো বিশেষ পরিচর্যা ছাড়াই যে হারে এই উদ্ভিদ বেড়ে ওঠে, তাতে উপকূলীয় অঞ্চলের বেকার জনগোষ্ঠী ও প্রান্তিক কৃষকরা এই খাতে বিনিয়োগ করে স্বাবলম্বী হতে পারেন। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি এই গুড় উৎপাদনকারীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও বিপণন সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবে এটি দেশের গুড় শিল্পের একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে। একই সঙ্গে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে গুড়ের মান আরও উন্নত করা গেলে এটি বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি করবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের উপকূলীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

‎‎উপসংহারে বলা যায়, টিনের চালার বিপ্লবের যুগে গোলপাতার ব্যবহার আগের চেয়ে কমে এলেও, গুড় উৎপাদনের এই নতুন সম্ভাবনা উপকূলীয় জনপদের মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। প্রথাগত গুড় শিল্পের ওপর চাপ কমিয়ে গোলপাতার রস থেকে উৎপাদিত এই পণ্যটি যাতায়াত ও সহজলভ্যতার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার দাবি রাখে। গোলগাছ চাষের এই সহজলভ্য পদ্ধতি এবং এর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে পরিবহন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে এটি একটি রোল মডেল হয়ে উঠবে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পুষ্টির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *