মুফতী আলমাছ হোসাইন: কোরবানি’ অর্থ উৎসর্গ করা, ছেড়ে দেয়া, উপঢৌকন, সান্নিধ্য লাভের উপায়, ত্যাগ করা, পশুত্বকে বিসর্জন ইত্যাদি। মহান আল্লাহ তা’য়ালার নবী হজরত ইবরাহিম (আ.) তার ছেলে হজরত ইসমাইলকে (আ.) আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশে আল্লাহর রাহে কোরবানি করার উদ্যোগ নেন। সেই থেকে ইসলাম ধর্মে কোরবানি নিয়ম প্রচলন হয়। এমন ধারণাই বহুল প্রচলিত। তবে ওই ঘটনাই ইসলাম ধর্মে প্রথম কোরবানির ঘটনা নয়। কারণ, ইসলাম ধর্মের প্রথম নবী ও প্রথম মানব হজরত আদমের সময়ও কোরবানির নিয়ম প্রচলিত ছিল। আবুল ফিদা হাফিজ ইবন কাসির দামেস্কির মতে, হযরত আদম আ: তার স্বীয় পুত্র দ্বয় হাবিল ও কাবিলকে কোরবানি করার আদেশ দিয়ে নিজে হজ করার জন্য মক্কায় চলে যান। আদম আ: চলে যাওয়ার পর তারা কোরবানি করেন। হাবিল একটি মোটা তাজা বকরি কোরবানি করেন। তার অনেক বকরি ছিল। আর কাবিল কোরবানি দেন নিজের উৎপাদিত নিম্নমানের এক বোঝা শস্য। তারপর আগুন হাবিলের কোরবানি গ্রাস করে নেয়।
আর কাবিলের কোরবানি অগ্রাহ্য করে (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২১৭)। সূরা মায়েদার ২৭ নং আয়াত থেকেও একথা সুষ্পষ্ট যে, হজরত আদম আ: এর সময়ও ইসলাম ধর্মে কোরবানির নিয়ম প্রচলিত ছিল। আজকে মুসলিম সমাজে কোরবানির যে প্রচলন তা মূলত মুসলিম মিল্লাতের বা জাতির পিতা হজরত ইব্রাহীম (আ.) এর দেখানো পথ বা সুন্নাত। হজরত ইব্রাহীম (আ.) এর শতবর্ষ বয়সের পর আল্লাহ তায়ালা তাঁকে যে সন্তান দান করেছিলেন, তিনি আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে তাঁর সে কলিজার টুকরা হজরত ইসমাইল (আ.) এর কোরবানির সূত্র ধরে আজও কোরবানি প্রচলিত আছে। ইসলাম ধর্মের সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, কোরবানি হচ্ছে— হজরত ইবরাহিমের (আ.) সুন্নত। হজরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)! এ কোরবানি কী? মহানবী (স.) এরশাদ করলেন, তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিমের (আ.) সালামের সুন্নত (সহিহ আবু দাউদ)।
আল কোরআনে কোরবানিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হজরত ইবরাহিম এবং হজরত ইসমাইলের ঘটনাও বিবৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- ‘অতঃপর সে যখন তার পিতার সঙ্গে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহিম বলল, ‘বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে আমি জবাই করছি, এখন তোমার অভিমত কী বলো?’ সে বললো, ‘হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন, তা করুণ। আল্লাহ ইচ্ছা করলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।’ যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলেন এবং ইবরাহিম তার ছেলেকে কাত করে শোয়ালেন, তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললাম, ‘হে ইবরাহিম! তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করলে!’ এভাবেই আমি সৎ কর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করে থাকি (সূরা সাফফাত: ১০২-১০৫)।’ হযরত ইব্রাহীম আ: স্বপ্নে আল্লাহর নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে এবং নিজ পুত্র হজরত ইসমাইলের সম্মতিতে হজরত ইবরাহিম কোরবানি করার মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
এ উদ্দেশ্যে তিনি পুত্র হজরত ইসমাইলকে নিয়ে মিনার একটি নির্জন স্থানে যান এবং তার চোখ বেঁধে মাটিতে শুইয়ে দেন। অতঃপর কোরবানি করার জন্য পুত্রের গলায় ছুরি চালান। কিন্তু আল্লাহ তার নির্দেশ পালনের প্রতি পিতা এবং পুত্রের অপরিসীম ত্যাগ স্বীকারে খুশি হন এবং হজরত ইসমাইলকে রক্ষা করেন। আর আল্লাহর তরফ থেকে পাঠানো একটি মেষকে (ভিন্ন মত দুম্বা) হজরত ইসমাইলের পরিবর্তে কোরবানি করা হয়। হজরত মুসার (আ.) সময়েও কোরবানি প্রথা চালু থাকার বিষয়টি আল-কোরআনেই উল্লেখ হয়েছে। সুরা বাকারায় বলা হয়েছে,‘স্মরণ করো, যখন মুসা আপন সম্প্রদায়কে বলেছিল, আল্লাহ তোমাদের একটি গরু জবাই করার আদেশ দিয়েছেন।’ এই আয়াত থেকে এ বিষয়টি আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, হজরত মুসার সময়েও কোরবানির প্রচলন ছিল।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) হজরত ইবরাহিমের সুন্নত হিসেবে তার উম্মতের জন্যও কোরবানির প্রচলন করেছিলেন। মহানবী নিজেও কোরবানি করেছেন। হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘একদা হজরত রাসুলুল্লাহ (স.) দুটি ধুসর বর্ণের শিংওয়ালা দুম্বা কোরবানি করছিলেন। তিনি ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে তা নিজ হাতেই জবাই করেছিলেন। হজরত আনাস বলেন, আমি মহানবীকে (স.) এর পাঁজরের ওপর পা রাখতে দেখেছি এবং জবাই করার সময়ে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলতে শুনেছি (সহিহ মুসলিম)। সুতরাং প্রথম মানব হজরত আদম থেকে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ পর্যন্ত প্রত্যেক নবীর উম্মতের জন্যই কোরবানির বিধান বলবৎ ছিল। হজরত মুহাম্মদের সা: অনুসরণে আজও সারাবিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা প্রতিবছর ওই বিধান যথাযথ ধর্মীয় অনুশাসন মেনেই পালন করছেন। আর এর মাধ্যমেই মুসলিম সমাজের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হয়। মুসলিমরা বিশ্বাস করেন,কোরবানি করা পশুর গোশত আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় না, আল্লাহ তার বান্দার ত্যাগ করার মানসিকতায়ই সন্তুষ্ট হন। মুসলিমদের এই বিশ্বাসের উৎস আল-কুরআন: ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের (কোরবানি করা পশু) গোশত এবং রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া’ (সূরা হজ : ৩৭)। প্রকৃতপক্ষে, সাদা চোখে কোরবানির মাধ্যমে নিরীহ পশুকে জবাই করার বিষয়টি দৃশ্যমান হলেও বাস্তবিক পক্ষে ওই পশু কোরবানির মধ্যেই মানুষের জন্য রয়েছে প্রভূত কল্যাণ ও সমৃদ্ধি।
কোরবানির অন্তর্নিহিত শিক্ষাকে যদি মুসলিমরা উপলব্ধি ও ধারণ করতে পারে, তবে তখনই কেবল কোরবানি অর্থ শুধু পশু জবাই নয়; বরং এর সুদূরপ্রসারী মানবকল্যাণের লক্ষ্যই পূরণ হবে। কোরবানি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই (হে নবী!) আমি আপনাকে (নিয়ামত পূর্ণ) কাওসার দান করেছি, অতএব, আপনি আপনার ‘রব’ এর সন্তুষ্টির জন্যে সালাত কায়েম করুন ও তাঁর নামে কোরবানি করুন’ (সূরা আল কাওসার-১০৮/১-২)। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করবে না সে যেন ঈদগাহের নিকটে না আসে’ (আহমদ ও ইবনে মাজাহ)। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, কোরবানির দিনে মানবসন্তানের কোনো নেক আমলই আল্লাহ তায়ালার নিকট তত প্রিয় নয়, যত প্রিয় কোরবানি করা। কোরবানির পশুর শিং, পশম ও খুর কিয়ামতের দিন (মানুষের নেক আমলনামায়) এনে দেয়া হবে। কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। সুতরাং তোমরা আনন্দচিত্তে কোরবানি করো’ (তিরমিজি)। তাই আসুন কোরবানী করি মহান প্রভুর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোন লোক দেখানোর মনমানষিকতায় নয়, এবং সুন্নতকে সমুন্নত করি যাতে পরকালে মুক্তির দিশা যোগার করতে পারি।
মুফতী আলমাছ হোসাইন
মোহতামীম, মাহমুদপুর দারুসসুন্নাহ বালিকা মাদরাসা
দোহার ঢাকা।
