ড্রেজারে ফসলি জমি ভরাটের মহাযজ্ঞ ! বিকট শব্দে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের লেখাপড়া বিঘ্ন

শ্রীনগর (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ  বর্ষা খাল বিলে পানি আসার সাথে সাথে প্রশাসনকে মেনেজ করে ড্রেজারে দিয়ে অবৈধভাবে ফসলি জমি ভরাটের মহাযজ্ঞ শুরু দিয়েছে বালু ও ভরাট সিন্ডিকেটের সদস্যরা। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা  না করে মুন্সীগঞ্জের  শ্রীনগর উপজেলার অধিকাংশ  এলাকার দুই ও তিন ফসলি জমি ড্রেজারের মাধ্যমে ভরাটের ফলে কৃষি বিলুপ্তির পথে এবং জন বসতির পাশে ড্রেজার স্থাপনের ফলে নিরবদি ড্রেজারের বিকট শব্দে চলমান এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের লেখাপড়া ব্যাপক  বিঘ্ন ঘটছে। কৃষি জমি ভরাটে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় আইন অমান্য করা হচ্ছে, অন্যদিকে খাল,জলাশয় ও বিলসহ কৃষি জমি ভরাটে পরিবেশের ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, উপজেলায় মোট জমির পরিমাণ ১২ হাজার ৬শত ৪৪ হেক্টর,নীট আবাদি জমির পরিমাণ ১২ হাজার ১শত ২২ হেক্টর,সাময়িক পতিত জমির পরিমাণ ৪শ হেক্টর, আবাদ যোগ্য পতিত জমির পরিমান ১শত ২২ হেক্টর,এক ফসলি ৮ হাজার ২০ হেক্টর,দুই ফসলি ৩ হাজার ৯শত ৬২ হেক্টর,তিন ফসলি ১শত ৪০ হেক্টর, ব্যবহার ভিত্তিতে মোট ফসল আবাদ মোট ১৬ হাজার ৩শত ৬৪ হেক্টর জমি রয়েছে।

এক শ্রেণীর অসাধু ড্রেজার ও বালু ব্যবসায়ীরা আইন ভঙ্গ করে ড্রেজারের দিয়ে ভরাটে প্রতি বছর শত শত একর কৃষি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা হচ্ছে। অথচ দায়িত্বশীল ভূমি কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় ব্যবহার ভিত্তিক শ্রেণি পরিবর্তন না করায় রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। নির্বিচারে কৃষিজমি ভরাটের কারণে অনেক জায়গায় বর্ষা সেচের পানি চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে,বাড়ছে জলাবদ্ধতা। কিন্তু এই আইনের তোয়াক্কা না করে নির্বিচারে ফসলি জমি ভরাট করা হচ্ছে। বিভিন্ন গ্রামে ফসলি জমিতে বাঁধ,ড্রেজার দিয়ে মাটি ভরাট করে বসতভিটা নির্মাণ করা হচ্ছে। বছরের পর বছর এই অবস্থা চললেও রহস্যজনক কারণে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না সরকারী ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা।

উপজেলায় অপরিকল্পিতভাবে প্রতি বছর সড়কের ধারে সরকারি খাস জমি, জলাশয়,খাল,বিল, ডোবা, পুকুরসহ আবাদি কৃষিজমি ভরাট হচ্ছে। এসব জমি ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে বসতঘর,রাস্তাঘাট,দালানকোঠা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ফসলের পরিবর্তে যেখানে শোভা পাচ্ছে পাকা দালানকোঠা। অব্যাহতভাবে ভরাট হওয়ায় উপজেলায় হ্রাস পাচ্ছে কৃষিজমি আর এতে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার হুমকিসহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

অথচ কৃষিজমি অক্ষত রেখে উন্নয়নের জন্য বারবার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে দুই ও তিন ফসলি জমি সংরক্ষণে তার জোড়ালো নির্দেশনা ছিল। কৃষিজমি সুরক্ষায় নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর তাগাদা উপেক্ষা করেই উন্নয়নের নামে কৃষকের স্বপ্ন ধ্বংস করা হচ্ছে।

বালুদস্যু ও ভরাট সিন্ডিকেটের সদস্যরা ফসলী কৃষি জমিগুলো ভেক্যু মেশিন দিয়ে গভীরভাবে কেটে পকেট তৈরী করে রাখছে। কেউ কেউ পকেট কাটার সাথে সাথে ড্রেজারের পাইপ বসিয়ে ভরাট কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে।

এ ভরাটের যোগান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বাঘড়া-ভাগ্যকুলের মাঝা মাঝি পদ্মা নদীর চড়ে অর্ধশতাধিক কাটিং ড্রেজার ও কৃষি জমি।অর্থাৎ এক জমি ভেক্যু দিয়ে কেটে পকেট করে।অন্য জমি থেকে কাটিং ড্রেজারের মাধ্যমে  পাইপ লাইন দিয়ে মাটি কেটে এনে পকেট ভরাট করা হচ্ছে।  এসব কাজ কারবার স্থানীয় ভূমি অফিসগুলোর  নাকের ডগায় ঘটলেও,যেন দেখার কেউ নেই।

বর্ষা তথা ড্রেজার মৌসুমকে সামনে রেখে  উপজেলার সর্বত্র খালে, বাড়ির পাশে জলাশয়ে ড্রেজার স্থাপনের ফলে নিরবদি ড্রেজারে বিকট শব্দে স্কুল পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীসহ চলমান এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে বলে জানান অভিভাবক ও শিক্ষকরা।

 উপজেলার ১৪ টি ইউনিয়নেই তৎপর হয়ে উঠা বালুদস্যু ও ভরাট সিন্ডিকেটের সদস্য বাঘড়া এলাকার আনু মেম্বার, আলম,ম্যাগনেট,ফরজ আলী, ভাগ্যকুলের কালা ছামাদ মেম্বার, মোশারফ মেম্বার,শাহ আলম সারেং মেম্বার, নাজিম সর্দার, জুলহাস কাকা,বালাশুরের জাহাঙ্গীর সর্দার, সুইট, উত্তর বালাশুরের রমজান মাদবর,রাঢ়ীখালের রোকন, তুহেল, কবুতরখোলার সৈকত, মামা মাসুদ, মাতিন, জশলদিয়ার আশরাফ চেয়ারম্যান, শামীম,কোলাপাড়ার আলামিন,নভেল,কুকুটিয়ার আজিম মেম্বার, সাজু, ফিরোজ, সিন্দরদির শামীম,খোদাই বাড়ির আবুল বেপারী, বিবন্দীর হাশেম আলী আমিন, পশ্চিম নওপাড়ার আলমগীর,আমির হোসেন,তন্তরের শাহিন,বাড়ৈগাওয়ের খলিল, নাগেরহাটের মিজান,আলমপুরের লাভলু মোড়ল,মোসলেম,শাহিন,আহসান,মদনখালীর রাসেল, আশা,হিরো,বাড়ৈখালীর সাঈদ, আরধীপাড়ার টিটুসহ আরো অনেকেই বছর ব্যাপী ড্রেজার দিয়ে এই ভরাট কর্মযজ্ঞ চালিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে তারা শত শত বিঘা কৃষি জমি ভেক্যু দিয়ে কেটে পকেট তৈরি  করে রেখেছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিবারের মত এবারও খাল বিলে পানি আসার সাথে সাথেই বালুবাহী ভলগেট এনে ভাসমান ড্রেজারের মাধ্যমে ঐ সব পকেট ভরাট কার্যক্রম শুরু করে দিয়ে। এসব ভূমি খেকো সিন্ডিকেটরা শুধু পকেট তৈরী  আর ভরাট করেই ক্ষ্যান্ত নয়,বরং তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ পাশ্ববর্তী জমির কৃষকরা।

বালাশুর এলাকার বালুদস্যু ও ভরাট সিন্ডিকেটের সদস্যরা রাঢ়ীখাল মৌজার ১নং খাস খতিয়ানে  আর এস ১৫৫০,১৫৫১,১৫৫২ দাগের প্রায় ১ একর সরকারী জমি অবৈধভাবে বালু ভরাট করেছে দখলে নিয়েছে ভুমিদুস্যুরা।

এব্যাপারে ভুক্তভোগী স্থানীয় কৃষকের কাছ থেকে জানা যায়, একটি জমিতে পকেট কাটলে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায় চার পাশের অন্যান্য জমির মালিকরা। কারন,পকেট তৈরীর সময় সীমানা লঙ্ঘন করে ক্ষেতের আইলসহ জমির ওপর মাটি ফেলে পাড় বেধে নেয় তারা। প্রতিবাদ করলে উল্টো হেনস্থার শিকার হতে হয় তাদের। তাই অনেক কৃষক তাদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পায় না।

সাম্প্রতিক কালে তৈরী করা যেসব পকেট বর্তমানে কাটিং ড্রেজারের মাধ্যমে ভরাট করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কতিপয় ব্যাক্তি বলেন, প্রশাসনকে ম্যানেজ করে সরকারি,বেসরকারী জলাশয় ও কৃষি জমি ভরাট করা হয়েছে । বর্তমানে ড্রেজার চলছে ভাগ্যকুল মান্দ্রা, বাঘড়া,ভাগ্যকুল,কামারগাঁও,ষোলঘর,কুকুটিয়া,বীরতারা চান্দারটেক,কুকুটিয়া,তন্তর ও কুশুরীপাড়া মিল্কভিটার সামনে।

পরিবেশ বান্ধব সুশীল সমাজের ব্যাক্তিরা মনে করছেন, সরকারের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন যদি কৃষিজমি ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিতে পারে তাহলে ১০থেকে ১৫ বছরের মধ্যে  এই অঞ্চলের কৃষি জমি একেবারেই বিলুপ্তি হয়ে যাবে।

কৃষিজমিতে বাড়ি নির্মাণে ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও অনুমতি নেওয়ার বিধান থাকলে কেউ মানছেন বিধান। নিজেদের ইচ্ছা মত কৃষিজমিতে বাঁধ দিয়ে বালু ফেলে ভরাট করা হচ্ছে বলে দাবি রাঢ়ীখাল ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল বারেক খান বারী। তিনি বলেন, ড্রেজার দিয়ে কৃষিজমি ভরাট দ্রুত বন্ধ না করলে অল্প সময়ের ব্যবধানে আমাদের এই অঞ্চলের কৃষিজমিগুলো আর টিকানো সম্ভব হবে না।

 অবৈধ ড্রেজার সিন্ডিকেট চক্রের অন্যতম সদস্য মোঃ জাহাঙ্গীরগং এর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা প্রশাসনসহ সবাইকে মেনেজ করেই এই ব্যবসা করি। আপনারা আসেন এক সাথে চা খাই।

এই বিষয়ে রাঢ়ীখাল ইউনিয়ন সহকারী তহসিলদার আমির হোসেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা ভেঙে দিয়ে আসার পর আবার অদৃশ্য শক্তির কারণে এরা কাজ করে কীভাবে আমাদের জানা নেই।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মোশারেফ হোসাইন বলেন, এসিল্যান্ড ছুটিতে রয়েছে। আমি  ইউনিয়ন তহসিলদারদের বলে দিয়েছি তারা ব্যবস্থা নেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *