বাংলাদেশে রমজান যেন ব্যবসার মাস!

পবিত্র রমজান মাসে ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির পরীক্ষা দিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চলে মূল্যছাড়ের প্রতিযোগিতা। মূলত রোজাদারের অর্থকষ্ট লাঘবের পাশাপাশি অধিক সওয়াবের আশায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসে এমন ছাড় দেওয়া হয়। কোথাও রাষ্ট্রীয়ভাবে, আবার অনেক দেশে ব্যবসায়ী সমিতি কিংবা ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে কমানো হয় পণ্যের দাম। আর বাংলাদেশে চোখে পড়ে তার উল্টো চিত্র, যে যেভাবে পারেন ব্যবসা করে নেন। অনৈতিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয় নিত্যপণ্যের দাম- বিষয়টি যেন একটি স্বাভাবিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের এমন আচরণ দেখে মনে হয়, রমজান যেন ব্যবসা করে নেওয়ার মাস! এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।

চট্টগ্রাম : ব্যবসাপাতি যা হবার এরই মধ্যে হয়ে গেছে। তাই পাইকারির মোকাম থেকে গলির দোকান কোথাও ছোলা-চিনি কিনতে মানুষের ভিড় নেই। সকালের দিকে কেবল গরুর মাংসের দোকানে ভিড়। আর বিকালে দুই জায়গায় ভিড় দেখা গেছে রেস্তোরাঁ ও সালাদ তৈরির উপকরণ নিয়ে বসা বিক্রেতাদের সামনে। অসময়ে হওয়ায় লেবুর দাম আগে থেকেই বাড়তি ছিল। গতকাল প্রথম রোজার দিনে তাতে আরও চাপ পড়েছে। পাতি লেবুর ডজন ৮০ থেকে ১২০ টাকা ছাড়িয়েছে।

একইভাবে বেশি টাকায় লোকজনকে কিনতে হয়েছে খিরা ও ধনেপাতার মতো পণ্যগুলো। কলা আর নারিকেলের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক। চট্টগ্রামের ভালোমানের কাঁঠালি কলার ডজন স্বাভাবিক সময়ে সর্বোচ্চ ১২০ টাকা বিক্রি হয়। গতকাল তা ১৬০ টাকায় ওঠে। নারিকেলের জোড়া ২৫০ টাকা, যা বছরের অন্য সময় বিক্রি হতো ১২০ টাকায়। দেওয়ানবাজার এলাকার এক কলেজশিক্ষক বলেন, ‘রমজান এলে বিভিন্ন দেশে ভোগ্যপণ্যের দাম কমে আর আমাদের দেশে বাড়ে। আমরাও এটা দেখে অভ্যস্থ হয়ে গেছি। ফলে এক জোড়া নারিকেলের দাম বেড়ে কোথায় গিয়ে ঠেকলো, তা নিয়ে এখন আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না।’

চকবাজার ও বহদ্দারহাটের মাংসের বাজারে গতকাল সকালের দিকে অত্যধিক ভিড় দেখা গেছে। গতকালও বাড়তি দামেই (৮০০ টাকা) মাংস কিনতে হয়েছে রোজাদারদের।

জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের সংগঠন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পক্ষে আজ থেকে নগরীতে ন্যায্যমূল্যে রমজানের পণ্য বিক্রি হবে। নগরীর আগ্রাবাদে সকালে এই কার্যক্রম শুরু হবে। এতদিন যারা ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা করেছেন, তারাও এখন ন্যায্যমূল্যে পণ্যবিক্রি শুরু করেছেন। খাতুনগঞ্জের শতাব্দী ট্রেডার্সের মালিক মো. আজমল জাহান বলেন, ‘রোজার পণ্যের ঊর্ধ্বগতির যে ধারা তা কমে গেছে। আগামী কয়েকদিনে তা আরও কমতে পারে।’

এদিকে চট্টগ্রামের রাউজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজার মনিটরিং করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জোনায়েদ কবির সোহাগ। মূল্য তালিকা না টাঙানো, বেশি দামে পণ্য বিক্রি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরিসহ নানা অপরাধে গতকাল ১১ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন তিনি।

রাজশাহী : রমজান উপলক্ষে মাসের প্রথম দিন গতকাল রোববার দুই-চারটি ছাড়া বাকি প্রায় সব পণ্যের দাম অপরিবর্তিত ছিল। শুধু শসা, বেগুন, পটল এবং কাঁচামরিচের দাম বেড়েছে। এদিকে রমজান মাসে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে রাজশাহী জেলা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অফিস গতকাল মহানগরীতে অভিযান চালায়। রাজশাহী জেলা অফিসের সহকারী পরিচালক মো. মাসুম আলীর নেতৃৃত্বে চলা এই অভিযানে ৯ হাজার ১০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ বিষয়ে মাসুম আলী বলেন, ‘রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার সহনীয় পর্যায়ে রাখতে মহানগরীর বেশকিছু এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় মহানগরীর বেলপুকুর এলাকায় মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করা, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য রাখা এবং ভোক্তা অধিকার আইন না মানায় কয়েকটি মুদির দোকানকে জরিমানা করা হয়। রমজানে নিত্যপণ্যের দাম ভোক্তার হাতের মুঠোয় রাখতে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

সিলেট :মাত্র তিনদিনের ব্যবধানে সিলেটে অধিকাংশ সবজির দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ঢেড়শ ৬০, শসা ৭০, গাজর ৮০ টাকা। এতদিন পাঁচ টাকায় বিক্রি করা শাকের আঁটি পাইকারি বাজার থেকেই কিনতে হচ্ছে সাড়ে আট টাকা দিয়ে। বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে রমজানের আগে যেমন প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম লাগাম ছাড়া থাকে, এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। সব পণ্যের দরই চড়া। ব্যতিক্রম শুধু পেঁয়াজ, এক সপ্তাহে দাম কমে এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকা কেজিতে।

বাজারে প্রশাসনের নজরদারিও প্রায় শূন্যের কোঠায়। রোববার সকালে শিবগঞ্জ এলাকা একটি শপিংমলে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের একটি অভিযানের কথা জানা যায়। তবে আশপাশের কোনো মানুষও টের পাননি যে, বাজার মনিটরিংয়ে জন্য প্রশাসন কোনো অভিযান চালাচ্ছে।

বরিশাল : রমজানের প্রথম দিনেই বরিশালের নিত্যপণ্য, কাঁচাবাজার ও ইফতারের প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। দুই-তিনদিন আগে পটল, বেগুনের কেজি ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা। গতকাল তা বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা দরে। ৩০ থেকে ৩৫ টাকার শশা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে। ৫০ টাকার কাঁচামরিচ ও করল্লা বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। এ ছাড়া কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা করে দাম বেড়েছে অন্যান্য কাঁচামালেরও। নগরীর চৌমাথা বাজারের ক্রেতা সাব্বির মাহমুদ বলেন, ‘গত পরশু ৫০ টাকা কেজি কাঁচামরিচ, ৪০ টাকা কেজি বেগুন ও শসা কিনেছি। অথচ আজকে তা দ্বিগুণ দামে কিনতে হয়েছে। এসব দেখার কেউ নেই। যার যা ইচ্ছে তাই হাঁকাচ্ছে। আমরা জনগণ নিরুপায়।’ একই বাজারের কাঁচামাল বিক্রেতা সোলাইমান হোসেন বলেন, ‘বাজারে পণ্য সরবরাহ অনেক, কোনো ঘাটতি নেই। তারপরও পাইকাররা দাম বাড়িয়েছেন, তাই আমরাও বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করছি।’

এদিকে রমজানের প্রথম দিনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা হলেও বরিশালের বাজারগুলোতে তার কোনো প্রভাব পড়েনি, বরং বাজার সিন্ডিকেটদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল সম্পূর্ণ বাজার ব্যবস্থা। বরিশাল জেলা বাজার নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্যরা জানান, দেশের সব জায়গায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে। তার প্রভাব পড়ছে রমজানের বাজারেও। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি তারপরও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি অকল্পনীয়। ফলে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। গ্রামের বাজারগুলোতে দাম কম থাকলেও সিন্ডিকেট রমজানের শুরুতে শহরের বাজারে দাম দ্বিগুণ বাড়িয়েছে। তাই সিন্ডিকেট না ভাঙলে কোনোভাবেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তারা।

বরিশাল নগরীর বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রকিবুল রহমান খান বলেন, ‘রমজানের প্রথম দিনে নগরীর বাজার তদারকির জন্য তিনটি ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করেছে। যেখানেই কোনো অনিয়ম বা অতিরিক্ত পণ্যমূল্য নিতে দেখা গেছে, সেখানেই জরিমানা আদায় করা হয়েছে। আগামীতে আরও কঠোরভাবে অভিযান পরিচালিত হবে।’

গাইবান্ধা : রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য যৌক্তিক ও সহনীয় পর্যায়ে রাখার লক্ষ্যে গতকাল গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মো. অলিউর রহমানের নেতৃত্বে বাজার মনিটরিং ও মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করা হয়। এ সময় দোকানে দোকানে মালের মজুদ, পণ্যের গুণগত মান ও বিক্রির রেজিস্টার যাছাই করা হয়। এ ছাড়া হোটেলের খাদ্যে কাপড়ের রং মিশানোর কারণে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জেলা প্রশাসক মো. অলিউর রহমান বলেন, ‘রমজান মাসে দ্রব্যমূল্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।’

জয়পুরহাট :পুরো রমজান মাসজুড়ে জয়পুরহাটে বাজার ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি)। গতকাল বেলা ১১টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ডিসি শরীফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম সোলায়মান আলী, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি হেলাল উদ্দিন, চেম্বার পরিচালক এমএ করিমসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিরা। সভায় নিত্যপণ্যের বাজার মনিটরিং, ভেজাল খাবার উৎপাদন বন্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক।

দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) : রমজানে দ্রব্যমূল্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীদের নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি সাত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে গতকাল দুপুরে পৌর শহর এলাকার মধ্যবাজারে এই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘পৌর শহর ছাড়াও উপজেলার প্রায় সবকটি বাজার মনিটরিং করা হবে। মজুদদার ও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *